রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমি থেকে বিতাড়িত ৪০তম ব্যাচের ৩২১ এসআই তাদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন। এ কলামে বিশ্লেষণ করা হয়েছে এই অব্যাহতির যৌক্তিকতা, প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া এবং ভবিষ্যৎ পরিণতি।

রাজধানীর ব্যস্ত গুলিস্তান এলাকায় পুলিশ সদরদপ্তরের সামনে সোমবার সকালে এক ব্যতিক্রমী দৃশ্যের অবতারণা হয়। ইউনিফর্মহীন একদল প্রাক্তন ক্যাডেট এসআই—যারা রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে কড়া নিয়মে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ অভিযোগে চাকরি হারিয়েছেন—তাঁরা মানববন্ধন করছেন পুনর্বহালের দাবিতে।
তাদের প্ল্যাকার্ডে লেখা: “এক বছরের পরিশ্রম, বৃথা কেন জানতে চাই”, “বেতন ছাড়া ৩৬৫ দিন, আমার চাকরি ফিরিয়ে দিন”, “রাষ্ট্রের বোঝা নয়, সেবক হতে চাই”—এগুলো যেন শুধু কিছু স্লোগান নয়, বরং এক গভীর বঞ্চনার প্রতিধ্বনি।
২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত চারটি ধাপে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে ৪০তম ব্যাচের ৩২১ জন ক্যাডেট এসআইকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রশাসনের ভাষ্যে, “নাশতা না খেয়ে হট্টগোল”, “প্রশিক্ষকের আদেশ অমান্য”, এবং “অমনোযোগিতা” ছিল মূল কারণ। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বচ্ছ তদন্তপ্রক্রিয়া বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ তাদের দেওয়া হয়নি বলেই দাবি বঞ্চিতদের।
চাকরি ফিরে পেতে একাধিকবার তারা সচিবালয় ও পুলিশ সদরদপ্তরের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। এমনকি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব আশ্বাস দিলেও বাস্তবায়নের কোনো অগ্রগতি হয়নি। এই আশ্বাস ও বাস্তবতার মধ্যকার ব্যবধান প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন তোলে।
মানববন্ধনে অংশ নেওয়া রুবেল চন্দ্র দাস ও রকিবুল হাসানদের বক্তব্যে ফুটে উঠেছে তারা কী রকম মানবেতর জীবন যাপন করছেন। এমন একজন নাগরিক যিনি প্রশিক্ষণের জন্য পরিবার ছেড়ে বছরব্যাপী নিবেদন করেছেন, তাকে
‘শৃঙ্খলা ভঙ্গ’-এর মতো অস্পষ্ট অভিযোগে চাকরিচ্যুত করে রাষ্ট্র কী বার্তা দিচ্ছে?
এই প্রক্রিয়ায় সরকারের বিনিয়োগ, সময় ও একটি সম্ভাব্য কর্মীশক্তির অপচয় হচ্ছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা জরুরি। এতে নাগরিকদের মধ্যে রাষ্ট্রের প্রতি আস্থাহীনতা জন্ম নিতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার নামে কতটুকু ‘দমন’ বৈধ? যদি কোনো শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হয়েই থাকে, তবে প্রক্রিয়াটি কি আইনি ও মানবিক ছিল? কেন আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি? পুলিশ বাহিনীর মতো একটি সংস্থায় এই প্রক্রিয়াগত জবাবদিহিতা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশাসনিক তদন্ত: একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনা যাচাই করা উচিত।
পুনর্বিবেচনার সুযোগ: অব্যাহতিপ্রাপ্তদের স্বচ্ছ শুনানির সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হতে পারে।
নীতিগত সংশোধন: প্রশিক্ষণকালীন আচরণ নিয়ন্ত্রণে একটি মানবিক ও মনস্তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি।
৪০তম ব্যাচের ৩২১ জন প্রাক্তন এসআইদের আন্দোলন শুধু একটি চাকরি ফিরে পাওয়ার দাবি নয়; এটি রাষ্ট্র, প্রশাসন এবং নাগরিকদের মধ্যকার আস্থার প্রশ্ন। তাদের পুনর্বহালের দাবি প্রশাসনের জন্য একটি পরীক্ষাস্বরূপ। দেখা যাক, এই সংকট থেকে রাষ্ট্র কী বার্তা দেয়—শৃঙ্খলা, না ন্যায়বিচার?
