আদালতে বিচারককে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বলে গালিগালাজ ও শাসানোর ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দোষীদের শাস্তির দাবিতে তিন কর্মদিবস সময় বেঁধে দিয়েছে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন। শাস্তি না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারি।

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ আবারও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের শিকার। কেরানীগঞ্জের এক মামলার প্রেক্ষাপটে আদালতে জামিন না পেয়ে বিচারককে প্রকাশ্যে ‘আওয়ামী লীগের দালাল’ বলে গালাগাল ও শাসানোর ভিডিও এখন সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল। এমন ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ জানিয়ে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (JSA) যে কঠোর ভাষার বিবৃতি দিয়েছে, তা নিছক সংগঠনের প্রতিক্রিয়া নয়—এটি বিচার বিভাগের অস্তিত্ব রক্ষার এক জোরালো সংকেত।
প্রকাশ্যে বিচারককে অপমান, হুমকি এবং রাজনৈতিক তকমা বসানো মানে শুধুমাত্র একজন বিচারকের ব্যক্তিগত সম্মানহানি নয়, এটি রাষ্ট্রের তিনটি মূল অঙ্গের একটির—বিচার বিভাগের—স্বাধীনতার বিরুদ্ধে সরাসরি আঘাত। বিচারকের সিদ্ধান্তে অসন্তোষ থাকলেও তার প্রতিকারে আইনগত পথই ছিল একমাত্র সঠিক পন্থা। আদালত এজলাস কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির মঞ্চ নয়, অথচ সেটাকেই ব্যবহার করা হলো রাজনৈতিক স্লোগান ছড়ানোর স্থানে।
১২ মে, কেরানীগঞ্জ মডেল থানার একটি হত্যাচেষ্টা মামলায় আসামি হানিফ মেম্বার আত্মসমর্পণ করেন। আদালত জামিন না দিয়ে তাকে কারাগারে পাঠান। পরে ১৭ মে নতুন করে জামিন আবেদন খারিজ হলে ক্ষুব্ধ কয়েকজন আইনজীবী বিচারকের প্রতি অশালীন ভাষায় চড়াও হন এবং রাজনৈতিক গালিগালাজ করেন।
এই ঘটনায় দেশজুড়ে নিন্দার ঝড় উঠেছে। ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর বিএনপিপন্থি চার আইনজীবীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরাম। অন্যদিকে জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন তিন দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে বলেছে—শাস্তি না হলে কঠোর কর্মসূচি আসবে।
জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের বিবৃতি বলছে, “বিচারিক কর্তৃত্বকে পাশ কাটিয়ে পেশী শক্তি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিজের পক্ষে আদেশ আদায়ের অপচেষ্টা স্পষ্টভাবে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও শৃঙ্খলার ওপর আঘাত।”
এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টিকোণ উন্মোচন করে—বাংলাদেশে বিচার বিভাগের ওপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের ছায়া কতটা গভীরভাবে বিরাজ করছে। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হলে দেশের গণতন্ত্র কেবল মুখের বুলি হয়ে দাঁড়ায়।
আইনজীবীরা যদি রাজনৈতিক পরিচয়ে বিচার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করেন, তাহলে তা পুরো আইন পেশার নৈতিকতা ও গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল এখনো এই ঘটনার বিষয়ে দৃঢ় অবস্থান নেয়নি—এটি উদ্বেগজনক।
বিচার বিভাগের প্রতিটি স্তরের প্রতি সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে, ভবিষ্যতে এমন নজির বাড়তেই থাকবে। তখন আর কোনো বিচারক স্বাধীনভাবে রায় দিতে সাহস পাবেন না, এবং জনগণের কাছে আদালতের নিরপেক্ষতা হারাবে।
১. দোষী আইনজীবীদের সনদ বাতিলসহ শাস্তি নিশ্চিত করা।
২. আদালতের এজলাসে নিরাপত্তা জোরদার করা।
৩. বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় রাষ্ট্র ও বার কাউন্সিলকে একযোগে ভূমিকা রাখা।
৪. রাজনীতিকে আদালতের সীমানার বাইরে রাখা।
এটি নিছক একটি জামিনের মামলা নয়। এটি বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা ও স্বাধীনতার উপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন। এখন প্রয়োজন দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি, যাতে ভবিষ্যতে কেউ আর বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক বলয়ের বাইরে দাঁড় করানোর সাহস না পায়।
