বিবিএস-এর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক তথ্য—২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে দেশে বেকার বেড়েছে ৬০ হাজার। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান কমেছে। বিশ্লেষণ পড়ুন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ১৮ মে ২০২৫-এ প্রকাশিত এক ত্রৈমাসিক শ্রমশক্তি জরিপে দেশে ক্রমবর্ধমান বেকারত্বের চিত্র উন্মোচন করেছে। ২০২৪ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে দেশে বেকার জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৬ লাখ ১০ হাজার, যেখানে মাত্র তিন মাস আগেও (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এই সংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৫০ হাজার। অর্থাৎ মাত্র তিন মাসে বেকার বেড়েছে ৬০ হাজার।
এই সংখ্যা শুধুমাত্র একটি পরিসংখ্যান নয়—এটি শ্রমবাজারের ভিত নাড়িয়ে দেওয়ার মতো একটি বার্তা। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এক বছরে দেশে বেকার বেড়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৩ সালে যেখানে বেকারের সংখ্যা ছিল ২৪ লাখ ৬০ হাজার, সেখানে ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ তা দাঁড়ায় ২৬ লাখ ১০ হাজারে।
২০২৪ সালে বেকারত্বের হার দাঁড়িয়েছে ৪.৪৮ শতাংশ, যা আগের বছরের ৪.১৫ শতাংশ থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বিবিএস-এর তথ্য অনুসারে, বর্তমানে পুরুষ বেকারের সংখ্যা ১৮ লাখ এবং নারী বেকারের সংখ্যা ৮ লাখ ২০ হাজার।
পুরুষদের বেকারত্বের হার ৩.৭৫ শতাংশ এবং নারীদের ৩.৪৬ শতাংশ—যা থেকে বোঝা যায়, পুরুষ শ্রমশক্তির মধ্যে বেকারত্ব বাড়ার প্রবণতা বেশি। এর পেছনে অন্যতম কারণ হতে পারে শিল্প ও নির্মাণ খাতে মন্দা, যা মূলত পুরুষশ্রমিকদের উপর নির্ভরশীল।
আরও আশঙ্কাজনক হলো, দেশে মোট শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণকারী মানুষের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৩ সালে যেখানে কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ৩৪ লাখ ৫০ হাজার, ২০২৪ সালের শেষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ১৭ লাখ ৩০ হাজারে।
এখন প্রশ্ন হলো—এই ১৭ লাখ ২০ হাজার কর্মক্ষম মানুষ গেল কোথায়? অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, কাজের সুযোগের অভাব এবং বিদেশে কাজের সুযোগ না পাওয়াও হতে পারে এই ঘাটতির অন্যতম কারণ। পাশাপাশি, অনেক নারী কাজের সুযোগের অভাবে গৃহকেন্দ্রিক হয়ে পড়ছেন, যা দেশের উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিবিএস-এর তথ্যমতে, কৃষি, সেবা এবং শিল্প—তিনটি খাতেই কর্মে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা কমেছে। যদিও দেশের সবচেয়ে বেশি মানুষ কাজ করে কৃষিখাতে, তবুও আবহাওয়া পরিবর্তন, জমির সংকোচন ও কৃষির প্রতি তরুণদের অনাগ্রহ কৃষি খাতকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
সেবা খাতে কর্মসংস্থানের সংকোচন অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে, কারণ এ খাতেই শহুরে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর বড় অংশ কাজ করে। শিল্পখাতে মন্দা মানে সরাসরি পোশাক খাত ও নির্মাণ খাতে সংকট, যা আবার রপ্তানি আয় এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগে প্রভাব ফেলে।
২০২৩ সালে যেখানে দেশের যুব শ্রমশক্তির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৬৭ লাখ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ কোটি ২৬ লাখে। এটি নিছক পরিসংখ্যান নয়—এটি আমাদের ভবিষ্যতের সংকেত। শিক্ষিত তরুণরা যদি কাজ না পায়, তাহলে তারা হতাশ হয়ে পড়বে, যা ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দিতে পারে।
এই মুহূর্তে সরকারের জন্য সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো—নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষতা ভিত্তিক প্রশিক্ষণ বাড়ানো।বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিল্প, পরিবেশবান্ধব কৃষি ও স্টার্টআপ খাতে সরকারি ও বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হবে।
এছাড়াও নারী শ্রমশক্তিকে কাজে লাগানোর জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। বেকারত্বের এ ধারা চলতে থাকলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা অনিবার্য হয়ে উঠবে।
