বাংলাদেশে মব সন্ত্রাস ও গণপিটুনির ক্রমবর্ধমান প্রবণতা উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বিশ্লেষণে উঠে এসেছে অন্তর্বর্তী সরকারের চ্যালেঞ্জ, পুলিশের দুর্বলতা এবং আইনের শাসনের প্রশ্ন।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে রাজনীতির নতুন অধ্যায় শুরু হলেও সমাজে ‘মব সন্ত্রাস’-এর মতো পুরনো সমস্যা আরও ভয়ংকর হয়ে দেখা দিয়েছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ‘আইনের শাসন’ নিশ্চিত করার কথা বললেও বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শাহারিয়ার আলম সাম্যর ছুরিকাঘাতে নিহত হওয়ার ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার তিনজনের একজন তামিম হাওলাদারের বাড়িতে ‘মব’ আগুন ধরিয়ে দেয়। অথচ পুলিশ নিজেই বলছে, তাকে সন্দেহভাজন হিসেবে ধরা হয়েছে, প্রমাণ মেলেনি। প্রশ্ন হলো, বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই এই আগ্রাসী প্রতিক্রিয়া কেন?
এই ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় শুধু পরিবারই নয়, পুরো রাষ্ট্রীয় আইন ব্যবস্থা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে। মব কারা তৈরি করছে? কীভাবে তারা এতটা সাহস পায়? কেন তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ বারবার ব্যর্থ?
বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম স্বীকার করেছেন, পুলিশের একার পক্ষে মব ঠেকানো সম্ভব নয়। ২০২৫ সালের মার্চ ও এপ্রিল মাসে পুলিশের বিরুদ্ধেই ৭২টি মব হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত ছয় মাসে ৭০টি বড় ধরনের হামলা হয়েছে পুলিশের ওপর।
তথ্য বিশ্লেষণ বলছে, অনেক ক্ষেত্রে এইসব মবের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী গোষ্ঠী বা পেশাদার অপরাধী। পুলিশ অভিযানে গেলে গ্রেপ্তার ঠেকাতে সংঘবদ্ধ হয়ে হামলা করছে একদল মানুষ।
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ বছরে গণপিটুনিতে ৭৯২ জন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০২৪ সালেই নিহত ১৭৯ জন। অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের পর এ ধরনের ঘটনায় প্রাণ গেছে আরও ১১৯ জনের।
কেউ অপরাধী কি না, সেটি প্রমাণ হওয়ার আগেই ‘মব জাস্টিস’-এর কবলে প্রাণ দিতে হচ্ছে মানুষকে। শুধু সন্দেহের বশে বিদেশি নাগরিক, অধ্যাপক, এমনকি অভিনেতাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।
বগুড়ায় হোমিওপ্যাথিক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ এস এম মিল্লাত হোসেনকে এনসিপির নেতাকর্মীরা মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। আবার অভিনেতা সিদ্দিককে মারধর করে রাস্তায় টেনে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য ভাইরাল হয়—তাকে ‘আওয়ামী দোসর’ বলে কটাক্ষ করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয়।
এসব ঘটনা একদিকে যেমন রাজনৈতিক প্রতিশোধের ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ব্যর্থতা ও ‘পাবলিক ট্রায়াল’-এর ভয়াবহ সংস্কৃতির প্রতিফলন ঘটায়।
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে হস্তক্ষেপ কমলেও এখন ‘মব হুমকির’ কারণে সংবাদমাধ্যম এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণে চলছে। সাংবাদিকদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক কাজ করছে যে, কোনো সংবাদের প্রতিক্রিয়ায় মব হামলা হতে পারে।
বাংলাদেশ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হকের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে ‘শক্ত অবস্থান’ নিতে হবে। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকারের উপর দেশবাসীর উচ্চ প্রত্যাশা থাকলেও তা কতটা পূরণ হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
বর্তমানে জনতার একাংশ মনে করে তারা নিজেই ‘বিচারক’। এই চিন্তাধারার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক দৃঢ়তা ও সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো সমাধান নেই।
বর্তমানে বাংলাদেশে ‘মব’ যেন কোনো সংগঠিত বাহিনী নয়, বরং এক ধরনের মানসিক প্রবণতা—যেখানে আইন নয়, আবেগের শাসন চলে। অথচ রাষ্ট্রের মূল ভিত্তিই হলো আইন এবং তার সঠিক প্রয়োগ।
অন্তর্বর্তী সরকারকে এই সংকট মোকাবিলায় শুধু নীতিগত অবস্থান নয়, মাঠ পর্যায়ে বাস্তবিক দৃঢ়তা দেখাতে হবে। নতুবা, এই সন্ত্রাসিক মানসিকতা আরও বিস্তৃত হয়ে সমাজের স্থিতিশীলতাকে তছনছ করে দেবে।
