খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. মোহসীন আলী ফরাজিকে হুমকি ও গালাগাল করেছেন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ। গ্যারেজ ইজারা না দেওয়ার জেরে ঘটে এ ঘটনা। বিশ্লেষণ করলেন ঘটনার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।

খুলনার রাজনৈতিক পরিবেশের এক ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে বৃহস্পতিবার (২৩ মে) দুপুরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কক্ষে ঘটে যাওয়া এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায়। বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান আসাদ তাঁর পছন্দের ব্যক্তিকে সাইকেল গ্যারেজ ইজারা না দেওয়ায় সরাসরি হাসপাতাল পরিচালক ডা. মোহসীন আলী ফরাজিকে হুমকি ও গালাগাল করেন। সিসিটিভি ফুটেজ এবং অডিও ক্লিপে ধরা পড়া এই আক্রমণাত্মক আচরণ প্রশ্ন তোলে:
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যখাত কি এখন রাজনৈতিক দখলবাজির নতুন ক্ষেত্র?
ঘটনার মূল সূত্রপাত ঘটে হাসপাতালের সামনের গ্যারেজটি নিয়ে। এটি আগে থেকেই ‘অন্তিকা এন্টারপ্রাইজ’ নামক প্রতিষ্ঠানের ইজারায় রয়েছে, যার মেয়াদ শেষ হবে আগামী জুনে। নিয়ম অনুসারে তখন দরপত্র আহ্বান করে নতুন ইজারা দেওয়া হবে। কিন্তু তা না মেনে বিএনপি নেতা আসাদ তার অনুসারীকে আগেভাগেই গ্যারেজের নিয়ন্ত্রণে বসাতে চান।
এই অনৈতিক চাপ প্রত্যাখ্যান করায় ডা. ফরাজিকে হুমকি দিয়ে বলেন, “১৬ বছর আওয়ামী লীগ পিটাইছি, সাহস থাকলে বাইরে বের হ’”।
এ ঘটনায় শুধু ডা. ফরাজিই নন, উপস্থিত চিকিৎসকরাও আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ঘটনার পর হাসপাতালের চিকিৎসকদের মাঝে ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং শনিবার থেকে আন্দোলনের প্রস্তুতির গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ঠিক একই ব্যক্তি—আসাদুজ্জামান আসাদ—গত ২ মার্চ সুন্দরবন গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির একজন জেনারেল ম্যানেজার শাহ আলম মোল্লার কক্ষে ভাঙচুর ও লাঞ্চিত করার অভিযোগেও অভিযুক্ত হয়েছিলেন। সে সময়ও তিনি দায় অস্বীকার করেছিলেন, যেমনটা তিনি করেছেন এবারও।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিচয় দীর্ঘদিন ধরেই প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক সুবিধা আদায়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। তবে এখন সেটি যখন সরাসরি স্বাস্থ্যখাতে প্রবেশ করছে,
তখন প্রশ্ন জাগে—মানবিক ও সেবামূলক খাত কতটা নিরাপদ?
একজন সরকারি চিকিৎসককে তাঁর অফিসে গিয়ে রাজনৈতিক নেতার এমন আচরণ শুধু আইনের শাসনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে না, একইসঙ্গে দেশের হাসপাতালগুলোর নিরাপত্তা ও পেশাগত স্বাধীনতাকেও বিপন্ন করে তোলে।
এধরনের ঘটনা যদি বারবার ঘটে, তবে মেধাবী পেশাজীবীরা কি আর সরকারি পদে দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হবেন?
হুমকিদাতা আসাদ সাংবাদিকদের বলেন, “এক নেতাকে দেখতে গিয়েছিলাম, তত্ত্বাবধায়কের ব্যবহার ভালো ছিল না।” অথচ সিসিটিভি ফুটেজ, অডিও ক্লিপ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য ভিন্ন কথা বলছে। রাজনীতিতে দায় অস্বীকার করে পার পাওয়া যেন এখন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে প্রশাসনের নীরবতা, দলীয় সমর্থনে দায়মুক্তির আশ্বাস, এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি আরও ভয়াবহ পরিস্থিতির জন্ম দিতে পারে।
খুলনা মেডিকেলের এই ঘটনা যেন একটি ছোট উদাহরণ মাত্র। এর পেছনে রয়েছে বৃহৎ রাজনৈতিক দখলদারিত্ব ও দুর্বৃত্তায়নের চক্র। এই চক্র যদি এখনই ভাঙা না যায়, তবে প্রশাসনিক কাঠামো ও পেশাদারিত্ব আরও দুর্বল হয়ে পড়বে।
এখন সময়—স্বাস্থ্যখাত ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় প্রভাবমুক্ত, নীতিভিত্তিক পরিচালনার জন্য কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার। নয়তো গ্যারেজ থেকে শুরু করে হাসপাতাল পর্যন্ত—সবই রাজনৈতিক হিংস্রতার শিকার হতে থাকবে।
