শরীয়তপুরের দুই যুবক ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা খরচ করেও ইতালি পৌঁছাতে পারেননি। লিবিয়ায় বন্দিত্ব, অমানবিক নির্যাতন ও মুক্তিপণের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরেছেন। মানবপাচার চক্রের ভয়ঙ্কর চিত্র তুলে ধরা হলো বিশ্লেষণধর্মী এই প্রতিবেদনে।

ইউরোপের স্বপ্ন মানুষকে কতটা অন্ধ করে তুলতে পারে, তা নতুন করে প্রমাণ করল শরীয়তপুরের ভেদরগঞ্জ উপজেলার দুই যুবকের বাস্তবভিত্তিক করুণ অভিজ্ঞতা। ‘মোট বেতনের চাকরি’ আর ‘ইতালির স্বপ্ন’ দেখিয়ে যে পথের সূচনা, সেটি গিয়ে শেষ হয়েছে লিবিয়ার মরুভূমি আর বন্দিশালার আতঙ্কে। এই অভিজ্ঞতা শুধু আলতাফ হোসেন ছৈয়াল ও আহসান উল্লাহ বলির নয়, এটি বাংলাদেশি তরুণদের একটি বৃহৎ অংশের কষ্টের প্রতিচ্ছবি।
দালালের আশ্বাসে চোখ বন্ধ করে পরিবার থেকে জমি বিক্রি, এনজিও থেকে ঋণ, ধারদেনা—সব মিলিয়ে ৬৪ লাখ টাকা খরচ করেন আলতাফ হোসেনের পরিবার। একইভাবে আহসান উল্লাহ বলির পরিবার খরচ করে আরও ৬৫ লাখ টাকা। কিন্তু গন্তব্য ইতালি নয়, বাস্তবতা ছিল লিবিয়ার বন্দিশালা।
প্রথমে দুবাই, এরপর মিশর হয়ে লিবিয়া। কিন্তু বিমানবন্দর থেকেই শুরু হয় দুঃস্বপ্ন। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় ছোট একটি ঘরে, যেখানে ৩০-৩৫ জনের সঙ্গে এক কক্ষে মানবেতর জীবন। এর পর ক্যাম্প, গুদামঘর, সাগরযাত্রার নামে নাটক সাজিয়ে পুলিশের হাতে তুলে দেয়া—সবই ছিল মানবপাচারকারীদের সুপরিকল্পিত ছক।
একপর্যায়ে চক্রটি পরিবার থেকে একের পর এক কিস্তিতে আদায় করে নেয় মুক্তিপণ। সারা প্রক্রিয়ায় মোট ১ কোটি ২৮ লাখ টাকা খরচ হলেও, তারা ফিরে আসেন শারীরিক ক্ষত ও মানসিক ট্রমা নিয়ে।
প্লাস দিয়ে নখ উপড়ে ফেলা, বৈদ্যুতিক শক, তার দিয়ে পেটানো, অনাহারে রাখা—এগুলো যেন লিবিয়ার দালালদের কাছে প্রতিদিনের রুটিন। আহসান উল্লাহ বলির কথায়, “আমাদের শরীর নয়, আত্মাটাকেই যেন হত্যা করেছে ওরা।”
ভেদরগঞ্জ থানায় দালাল হারুন লস্কর ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত হারুন লস্কর দাবি করেন, তিনি কারও কাছ থেকে টাকা নেননি। যদিও পুলিশ বলছে, তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা নেয়া হবে।
এখানেই প্রশ্ন— এতবড় একটি মানবপাচার নেটওয়ার্ক কীভাবে এতদিন ধরে গোপনে কাজ করল? পুলিশের ‘তদন্ত’ কখন শেষ হবে? পরিবারগুলো কি আর্থিকভাবে পুনর্বাসন পাবে?
এই দুই যুবকের ঘটনা প্রকাশ পেলেও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই মাসে একই ইউনিয়নের আরও ১১ জন যুবক নিখোঁজ রয়েছেন লিবিয়ায় যাওয়ার পর থেকে। এই চক্র আসলে কত বিস্তৃত, তা বুঝতে হলে সরকারের বিশেষ তদন্ত ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি।
বাংলাদেশের প্রান্তিক যুবকদের ইউরোপের স্বপ্নে ভাসিয়ে একটি বিশাল মাফিয়া নেটওয়ার্ক সক্রিয় হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও ইউরোপের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা এই দালালচক্র শুধু বাংলাদেশের তরুণদের নয়, তাদের পরিবারগুলোকেও চিরতরে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।
বাংলাদেশ থেকে লিবিয়া হয়ে ইউরোপ যাওয়ার রুটটি এতটা ভয়াবহ হলেও তা এখনো জনপ্রিয়। কারণ:
- ইউরোপের প্রতি অন্ধ মোহ ও স্বপ্ন
- দেশে কাজের অভাব ও দারিদ্র্য
- প্রবাসী পরিচিতজনের সফলতার গল্প
- স্থানীয় দালালদের মিথ্যা আশ্বাস
দালালরা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীদেরও টার্গেট করছে তারা। ফলে এই চক্র এখন বৈশ্বিক নিরাপত্তার হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
এই চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ না নিলে, আগামী বছরগুলোতে আরও অনেক পরিবার এমন দুঃস্বপ্নের শিকার হবে। পাশাপাশি প্রবাসে ভালো চাকরির মিথ্যা স্বপ্নের পেছনে না দৌঁড়ে দেশের ভেতর প্রশিক্ষণ, উদ্যোক্তা সহায়তা ও বিদেশে বৈধ উপায়ে কাজের সুযোগ বাড়ানো উচিত।
আহসান উল্লাহ বলির মতো আরও বহু যুবক এখনো মুখ খুলতে ভয় পান। সরকার, গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর উচিত—এই নির্যাতিত কণ্ঠগুলোকে সাহস দেওয়া, দালালদের বিচারের মুখোমুখি আনা এবং বিদেশে কাজের নামে এই আধুনিক দাসব্যবসার অবসান ঘটানো।
