জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি ড. আলী রীয়াজ জানিয়েছেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য না হয়, তবে তিনি দায়িত্ব ছাড়ার আগে সবকিছু জনগণকে জানিয়ে দেবেন। সাক্ষাৎকার বিশ্লেষণে উঠে এলো রাষ্ট্র সংস্কারের পথ ও পাথর।

ড. আলী রীয়াজ – যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, গবেষক এবং বিশ্লেষক – এখন বাংলাদেশের জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতির গুরুদায়িত্বে। ১৫ আগস্ট যার মেয়াদ শেষ হবে, সেই কমিশনের গত সাত মাসের কাজ নিয়ে বুধবার (২১ মে) জাতীয় সংসদ ভবনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি যে বার্তাটি দিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে রাষ্ট্র সংস্কারের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনায় গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেছেন, “সব রাজনৈতিক দলকে এক প্ল্যাটফর্মে আনতে চেষ্টা করব। যদি না পারি, দায়িত্ব ছাড়ার আগে জনগণকে সব জানিয়ে যাব।” তাঁর এই বার্তা একদিকে যেমন দায়িত্বশীলতার প্রতিচ্ছবি, অন্যদিকে এটি একটি রাজনৈতিক সতর্ক সংকেত।
ড. রীয়াজ জানিয়েছেন, ছয়টি মূল ক্ষেত্র—নির্বাচন, পুলিশ, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, জনপ্রশাসন ও সংবিধান—নিয়ে কমিশন কাজ করেছে। এই ছয় খাতভিত্তিক সাব-কমিশনের কাছ থেকে আসা কয়েক শত সুপারিশের মধ্য থেকে বাস্তবায়নযোগ্য ১৬৬টি প্রস্তাব বাছাই করে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এই ১৬৬টি সংস্কার প্রস্তাবকে আবার দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে—প্রায় ১০০টি আশু করণীয়, বাকিগুলো দীর্ঘমেয়াদি। আশাব্যঞ্জকভাবে জানা যায়, অধিকাংশ প্রস্তাবেই রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। তবু কিছু গঠনমূলক মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
ঐকমত্যের পথে প্রধান অন্তরায়গুলোর মধ্যে রয়েছে:
- রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী পদের মেয়াদসংক্রান্ত সীমা
- সংসদের কাঠামো—এককক্ষ বা দ্বিকক্ষ
- নারীদের নির্বাচনে সরাসরি অংশগ্রহণ
- নির্বাচন পদ্ধতি ও শাসন কাঠামো
এগুলো যে শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, তা নয়। এগুলো ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র কাঠামোর মৌলিক রূপরেখা নির্ধারণ করবে।
ড. রীয়াজের নেতৃত্বে এখন লক্ষ্য “জুলাই সনদ” নামে পরিচিত একটি ঐতিহাসিক দলিল রচনার। সেখানে থাকবে—রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন, নির্বাচন পদ্ধতি, ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, রাজনৈতিক নেতৃত্বের মেয়াদ ইত্যাদি। এটি হবে একরকম জাতীয় চুক্তিপত্র, যা সংবিধানের বাইরের হলেও রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে পথপ্রদর্শক হবে।
সংস্কারের প্রশ্নে বিএনপি এবং নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) – যারা তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা সামনে রেখে গড়ে উঠেছে – এদের মধ্যে মতানৈক্য থাকলেও ড. রীয়াজ মনে করেন, উভয় দলের মতামতই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে আবারও দেখা যাচ্ছে, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষার মধ্যে সমন্বয় না ঘটলে জাতীয় ঐকমত্য অসম্ভব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমেরিকার গবেষণালয় হয়ে তিনি আজ জাতীয় ঐকমত্যের কান্ডারি। আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজ (এআইবিএস) ও আটলান্টিক কাউন্সিলে তাঁর কার্যক্রম আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি গড়তে সহায়ক হয়েছে।
ড. আলী রীয়াজের বক্তব্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকটি হলো, তিনি সব তথ্য জনসমক্ষে তুলে ধরার অঙ্গীকার করেছেন, যদি রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে না পৌঁছায়। এই অঙ্গীকার আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি শক্তিশালী দায়বদ্ধতার নিদর্শন।
“গণতন্ত্র মানে কেবল নির্বাচন নয়, রাষ্ট্রের কাঠামোতে জনগণের বিশ্বাস পুনঃস্থাপন করাও এক ধরনের সংস্কার।” – এই দৃষ্টিভঙ্গিতেই ড. রীয়াজের প্রচেষ্টা মূল্যায়নযোগ্য।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের কাজ শুধু প্রস্তাব তৈরির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো নির্ধারণে একটি দিকনির্দেশক দলিল হয়ে উঠতে পারে। ঐকমত্য না হলে জনগণই হবে চূড়ান্ত বিবেচনাকারী—এটাই ড. রীয়াজের বার্তা।
এই বাস্তবতাকে সামনে রেখে রাজনীতিকদের এখন প্রয়োজন আত্মসমালোচনা, সংলাপ এবং আন্তরিক অংশগ্রহণ
