ঢাবির ভর্তি পরীক্ষায় ‘জুলাই শহীদ’ পরিবারের সদস্যদের জন্য কোটা চালুর সিদ্ধান্তে ফের বৈষম্যের অভিযোগ। এই নীতি কি শহীদের ত্যাগের অবমূল্যায়ন?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট প্রোগ্রামে ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে ‘বিশেষ সুবিধা’ বা কথিত কোটাভিত্তিক ভর্তি পদ্ধতি চালুর ঘোষণা আবারো কোটাবিরোধী আন্দোলনের মৌল চেতনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে শুরু হওয়া কোটা-বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে প্রাণ দিয়েছিলেন অনেকে, আহত হয়েছিলেন শতাধিক ছাত্র। সেই আন্দোলনের প্রধান দাবি ছিল সবধরনের বৈষম্যমূলক কোটা বাতিল করে মেধাভিত্তিক ভর্তি ও নিয়োগ নিশ্চিত করা। অথচ, সেই শহীদদের নামেই এখন আবার কোটা চালু করা হচ্ছে—তা যতই ‘অস্থায়ী’ বলা হোক না কেন, এর তাৎপর্য অনেক গভীর।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তে কী আছে?
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) সূত্রে জানা গেছে, ২৬ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, জুলাই-আগস্ট আন্দোলনে শহীদ ও আহতদের স্ত্রী, সন্তান, না থাকলে ভাই-বোনরাও ২০২৪–২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রথম বর্ষে ভর্তিতে বিশেষ সুবিধা পাবেন।
ডিন কমিটির সিদ্ধান্তে অনুমোদিত এই ‘সুবিধা’ সরাসরি কোটা হিসেবে না দেখালেও এটি আসলে বৈষম্যমূলক কোটা নীতিরই পুনরাবৃত্তি। যদিও সরকারের দাবি অনুযায়ী, এটি শুধুমাত্র চলতি শিক্ষাবর্ষের জন্য প্রযোজ্য, তবে ইতিহাস বলে—একবার চালু হলে এমন নীতির স্থায়িত্ব চিরকালীন হয়ে দাঁড়ায়।
ছাত্রসমাজ কী বলছে?
মাত্র কয়েক মাস আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ‘পোষ্য কোটা’ বাতিলের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছিলেন। অথচ, এখন ঢাবি প্রশাসনই সেই কোটাকেন্দ্রিক বৈষম্যের নতুন দরজা খুলে দিচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, বিজ্ঞান ইউনিটে প্রতি আসনের বিপরীতে ৭৭ জন শিক্ষার্থী আবেদন করেছেন। এক্ষেত্রে ৬০ স্কোর পাওয়া শিক্ষার্থী বাদ পড়ে যদি শহীদ পরিবারের সদস্য ৫০.৫ স্কোর পেয়ে ভর্তি হন, তাহলে সেটিকে কি ন্যায্যতা বলা যায়?
এই প্রশ্ন উঠছেই, উঠবেও—কারণ এই কোটানীতির ফলে অন্যদের পরিশ্রম ও মেধার অবমূল্যায়ন হয়। এমন বৈষম্যেরই তো বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন ‘জুলাই শহীদ’রা!
বিকল্প সমাধান কী?
বিশেষ সুবিধা দেওয়ার নামে কোটা চালু না করে, শহীদ ও আহতদের পরিবারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে আর্থিক অনুদান, চিকিৎসা সহায়তা এবং পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করাই ছিল শ্রদ্ধার যোগ্য উপায়। ভর্তি পরীক্ষায় বৈষম্য সৃষ্টি করে নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় একটি প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠান—এখানে প্রত্যেকে মেধার ভিত্তিতে আসন পাওয়ার সমান সুযোগ দাবি করে। জুলাই-আন্দোলনের চেতনা সেই চিরায়ত বৈষম্যবিরোধী বার্তাই পৌঁছে দিয়েছিল।
ভবিষ্যতের বার্তা কী হওয়া উচিত?
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কাজ সরকারের ‘সন্তোষ’ অর্জন নয়, বরং সাম্যবাদের নীতি রক্ষা করা। আজ যদি আবার কোটা ফিরিয়ে আনা হয়, তাহলে আগামী প্রজন্ম আবারও এক নতুন আন্দোলনের পথে হাঁটবে। এবং তখন প্রশ্ন উঠবেই—এই যে শহীদের ত্যাগ, তা কি শুধুই রাজনৈতিক বারগেইনিংয়ের উপকরণ?
সরকার ও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে—ভর্তি ও নিয়োগে শুধুই মেধার মূল্যায়ন হবে, কোনো ধরনের পারিবারিক পরিচয়, পেছনের ইতিহাস কিংবা রাজনৈতিক সুবিধা দিয়ে তা নস্যাৎ করা হবে না।
আমরা আর কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে কোটা দেখতে চাই না—বিশেষ করে সেই শহীদের রক্তের বিনিময়ে, যাঁরা বৈষম্যবিরোধী সমাজ গঠনের শপথে রাস্তায় নেমেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এই বিশেষ কোটা অবিলম্বে বাতিল করা হোক। শিক্ষা হোক সবার জন্য সমান ও ন্যায়সঙ্গত।
