অর্থনৈতিক সংকটে ধুঁকছে বাংলাদেশ। উৎপাদন বন্ধ ৬০% কারখানায়, ঋণের সুদ ১৬% ছাড়িয়েছে, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট তীব্র। শিল্পপতিরা বলছেন, শিল্প ধ্বংসের ষড়যন্ত্র চলছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ গভীর সংকটে। একদিকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট, অন্যদিকে ঋণের উচ্চ সুদহার, উৎপাদন ব্যয়ের লাগামহীন বৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার প্রভাবে শিল্প-কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে হারে হারে। শিল্পপতিরা বলছেন, এটা কেবল সংকট নয়, বরং শিল্প ধ্বংসের সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
🏭 শিল্পে উৎপাদন বন্ধ ৬০% কারখানায়
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (BTMA) তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬০% টেক্সটাইল কারখানায় উৎপাদন কার্যত বন্ধ। গ্যাসের মূল্য ২০২৩ সালে ১৭৮% এবং চলতি বছর ৩৩% বেড়েছে, কিন্তু সরবরাহ কার্যত নেই। গ্যাস না পেয়েও কারখানাগুলোকে ১০ কোটি টাকার মতো বিল দিতে হচ্ছে।
BTMA সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল স্পষ্ট ভাষায় বলেন, “২০২৫ সালে শুধু শিল্প নয়, শিল্পোদ্যোক্তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে।” তিনি আরো হুঁশিয়ারি দেন, “শিল্প বাঁচাতে না পারলে দেশে দুর্ভিক্ষ হবে।”
💰 ঋণের সুদহার ১৬% ছাড়িয়েছে: বিনিয়োগ শূন্যের কোটায়
বর্তমানে ব্যাংকঋণের গড় সুদহার ১৬% ছাড়িয়ে গেছে। উচ্চ সুদে ব্যবসায়ীরা ঋণ নিতে সাহস পাচ্ছেন না, ফলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ২১ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে, মাত্র ৬.৮২%। এতে নতুন বিনিয়োগ একপ্রকার স্থবির হয়ে গেছে।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের এমডি সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, “উচ্চ সুদ এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। কেউ নতুন প্রকল্পে যাচ্ছে না।”
👷♂️ বেকারত্ব বেড়েছে ৩.৩০ লাখ: সেবা খাতে বিপর্যয়
বেকার সংখ্যা এক বছরে বেড়ে ২৭ লাখ ৩০ হাজারে পৌঁছেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেবা খাত, বিশেষ করে নারী কর্মসংস্থান। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এটা শুধু আর্থিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্যও হুমকি।
🔌 বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকটে উৎপাদন থমকে দাঁড়িয়েছে
বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন গড়ে ৬-৭ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। বিদ্যুৎ আর গ্যাসের এই ঘাটতির কারণে উৎপাদনশীল সময় কমে আসছে, বাড়ছে অপচয়। শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো এখন শ্রমিক বসিয়ে রেখেও বেতন দিতে বাধ্য হচ্ছে।
📉 রাজস্ব আদায়ে পতন, সরকারের ব্যাংকঋণ ৬০% বেড়েছে
২০২৪-২৫ অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এনবিআরের রাজস্ব প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.২৪% — যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। বিপরীতে, সরকার ব্যাংক খাত থেকে ৯৮৫ বিলিয়ন টাকা ঋণ নিয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৬০% বেশি। ফলে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যাংক ঋণ কার্যত বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
⚠️ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নির্বাচন ঘিরে নতুন শঙ্কা
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে অনিশ্চয়তা নতুন করে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিদেশি বিনিয়োগ বন্ধ হয়ে গেছে। দেশি বিনিয়োগকারীরাও অপেক্ষার ভঙ্গিতে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা না ফিরলে এই সংকট আরও ভয়াবহ হবে বলে আশঙ্কা অর্থনীতিবিদদের।
🧠 বিশ্লেষণ ও করণীয়
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. মাশরুর রিয়াজ বলেন, “চাহিদা কমেছে, উৎপাদন কমেছে, বিনিয়োগ বন্ধ। একে পুনরুদ্ধার করতে হলে জ্বালানি, আর্থিক নীতি এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে।”
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, “বাজারে অসম প্রতিযোগিতার কারণে নতুন বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এটা বন্ধ না হলে শিল্পায়ন থমকে যাবে।”
বর্তমান বহুমুখী সংকট কেবল ক্ষণস্থায়ী চ্যালেঞ্জ নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির জন্য এক গম্ভীর সতর্ক সংকেত। এখনই যদি সরকার জ্বালানি, সুদহার, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতায় নজর না দেয়, তাহলে দেশের অর্থনীতি ভয়াবহ এক মন্দার দিকে ধাবিত হতে পারে।
