২০০১ সালে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় অভিযুক্ত খলিলুর রহমান কীভাবে ২৩ বছর আত্মগোপনের পর জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হলেন? ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিতে নিয়ন্ত্রণ ও রোহিঙ্গা ইস্যুতে তার প্রভাব কী?
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সির নিয়ন্ত্রণ রাখতে খলিলের পুকুর চুরি
একসময় প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের বিতর্কিত কর্মকর্তা, পরে ২৩ বছর যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপনে, আর এখন দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে—জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তিনি ড. খলিলুর রহমান। কিন্তু তাঁর অতীত ঘিরে রয়েছে এক ভয়ঙ্কর ইতিহাস—ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত। এখন প্রশ্ন উঠছে, ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির নিয়ন্ত্রণ তাঁর জন্য শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং এটি কি বৃহৎ একটি ভূ-রাজনৈতিক অপারেশনের অংশ?
২০০১ সালের নীলক্ষেত হত্যা ও ধর্ষণ: চাপা পড়ে যাওয়া ভয়ঙ্কর সত্য
২০০১ সালে ঢাকার নীলক্ষেতে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান প্রধান উপদেষ্টার প্রটোকল অফিসার আয়েশা আফসারী। পরে তাঁর স্বামী আত্মহত্যা করেন। যদিও শুরুতে বিষয়টি পারিবারিক কলহ বলে ধামাচাপা দেওয়া হয়, তদন্তে উঠে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য—আয়েশা ছিলেন ধর্ষণের শিকার। অভিযুক্ত—প্রধান উপদেষ্টার আত্মীয় এবং পিএস-১, খলিলুর রহমান।
ধর্ষণের পর প্রলোভন দেখিয়ে খলিল আয়েশাকে নিউইয়র্কে পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেখানে সুযোগ না পাওয়ায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে পরিবার, আর ঘটনার পরপরই খলিল দেশ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান।
যুক্তরাষ্ট্রে আত্মগোপন ও ‘রজার রহমান’ পরিচয়ে জীবন
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নর্থইস্ট নিউজ প্রকাশ করে—খলিল দেশ ত্যাগের পর পরিচয় গোপন করে ছদ্মনামে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস শুরু করেন। নাম পরিবর্তন করে হন রজার রহমান। ২০১৪ সালে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন—নিজেকে বিএনপির কর্মী হিসেবে দাবি করে দেশে প্রাণনাশের আশঙ্কার কথা জানান। অথচ এই আত্মগোপনের মূল কারণ ছিল ধর্ষণ মামলা থেকে বাঁচা।
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে খলিলের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব
ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা শেয়ারহোল্ডার ছিলেন খলিলুর রহমান। স্ত্রী নুরুন্নাহার রহমানকে নমিনি করে তিনি একপ্রকার আড়ালেই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখেন। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে ফিরে আসার পর তাঁর স্ত্রীকে ট্রাস্ট বোর্ডের সদস্য করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত হয়।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এটি কেবল একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, তরুণ সমাজ, অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক প্রভাব ব্যবস্থাপনায় এটি একটি কৌশলগত হাব হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনে ইস্টওয়েস্টের কিছু শিক্ষার্থীর সক্রিয়তা এবং আর্থিক পৃষ্ঠপোষকতা খলিলের দিকেই ইঙ্গিত করে।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ
২০২৪ সালে অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ পান খলিলুর রহমান। পাশাপাশি রোহিঙ্গা বিষয়ক নীতিনির্ধারণী দায়িত্বও তার হাতে। একজন ধর্ষণ মামলার আসামি কীভাবে এত গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত হন—তা নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন।
কেউ কেউ দাবি করছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বা আন্তর্জাতিক মহলের চাপেই এই নিয়োগ সম্ভব হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বনাম নাগরিক দায়
২৬ বছর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস, ছদ্মনামে পরিচয়, এখনো দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে নীরবতা—সব মিলে এটি শুধু নৈতিক নয়, রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার বিরুদ্ধেও স্পষ্ট আঘাত। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও অভিবাসন নীতির প্রধান দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির পরিচয়ই যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর বিশ্বাসযোগ্যতা কোথায় দাঁড়ায়?
একজন ধর্ষণ মামলার আসামি যিনি আত্মগোপনে ছিলেন, ছদ্মনামে জীবনযাপন করেছেন, তিনি আজ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দায়িত্বে। তাঁর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে একটি বিশ্ববিদ্যালয়, তরুণ সমাজ এবং সম্ভবত একটি বৃহৎ আন্তর্জাতিক এজেন্ডা। এটি শুধুমাত্র ব্যক্তি খলিলের নয়—একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নৈতিকতা ও ভবিষ্যতের প্রশ্ন।
