গত ৯ মাসে বাংলাদেশে চাকরি হারিয়েছেন ৪ হাজার পেশাদার সাংবাদিক। নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে জামাত-শিবির ও বিএনপি ঘরানার দালালচক্র। গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা ও পেশাদারিত্ব এখন মারাত্মক হুমকিতে।
গত ৯ মাসে বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে চলছে এক নিঃশব্দ বিপর্যয়। চাকরি হারিয়েছেন অন্তত ৪ হাজার পেশাদার সংবাদকর্মী—যাদের অনেকেই দুই থেকে তিন দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। আর এই শূন্য জায়গা দখল করে নিয়েছে এমন এক গোষ্ঠী, যারা সাংবাদিকতার কোনো মৌলিক নীতিমালা না জেনেও সংবাদমাধ্যমকে রাজনৈতিক প্রপাগান্ডার মেশিনে পরিণত করছে।
পেছনের কারণ: সংকোচন, চাপ, ও চক্রান্ত
গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ভেতরে-মাঝে চলছে খরচ কমানোর জবরদস্তি নীতি।
একদিকে মালিকপক্ষ আর্থিক ক্ষতির অজুহাতে ছাঁটাই করেছে অভিজ্ঞ সংবাদকর্মীদের, অন্যদিকে চলছে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট নিয়োগ।
এক গণমাধ্যম সম্পাদকের বক্তব্য:
“আমাদের ওপর চাপ এসেছে—নির্দিষ্ট মতাদর্শের লোক নিয়োগ করার জন্য। কেউ কেউ তো একেবারে দালাল বসিয়ে দিয়েছে রিপোর্টিংয়ে।”
সাংবাদিকতা হারাচ্ছে মৌলিক মানদণ্ড
তথ্যনিষ্ঠতা, নিরপেক্ষতা, জনস্বার্থ—এই তিন মূল স্তম্ভেই এখন আঘাত।
পেশাদারদের ছাঁটাইয়ের ফলে তৈরি হয়েছে অভিজ্ঞতার বিশাল শূন্যতা।
নতুন নিয়োগপ্রাপ্তদের অনেকে জানেন না রিপোর্টিংয়ের ন্যূনতম নীতিমালা, অথচ তাদের দিয়েই লেখা হচ্ছে বড় হেডলাইন, বিতর্কিত প্রতিবেদন।
সাংবাদিক শহিদুল ইসলাম বলেন—
“আমরা কাজ করেছি তথ্যের পেছনে। এখনকার ছেলেরা কাজ করে এজেন্ডার পেছনে।”
জামাত-শিবির ও বিএনপি ঘরানার দখলদারিত্ব
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই সংকট কাজে লাগিয়ে অনেক রাজনৈতিক সংগঠনের মিডিয়া শাখা সরাসরি ঢুকে পড়েছে মূলধারার সংবাদপত্র ও অনলাইন পোর্টালে।
বিশেষত জামাত-শিবির ও বিএনপি ঘরানার কিছু গোষ্ঠী গণমাধ্যম ব্যবহার করছে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হস্তক্ষেপে।
তারা একদিকে সত্য আড়াল করছে, অন্যদিকে জনগণের মনে বিভ্রান্তি ও অনাস্থা সৃষ্টি করছে গণমাধ্যমের ওপর।
গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা এখন প্রশ্নের মুখে
বর্তমানে দেশের প্রায় সব বড় মিডিয়া হাউসেই চলছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নৈতিক দ্বন্দ্ব এবং মানহীন কনটেন্ট প্রকাশের প্রবণতা।
জনগণ এখন প্রশ্ন তুলছে—“আসলে কে লিখছে এই খবর?”
পাঠক হারাচ্ছে আস্থা, সম্পাদক হারাচ্ছে স্বাধীনতা, আর সংবাদকর্মীরা হারাচ্ছেন পেশাগত নিরাপত্তা।
রাষ্ট্র এখনো নীরব
এই ভয়াবহ পটপরিবর্তনের মধ্যে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না।
গণমাধ্যম একটি রাষ্ট্রের ‘চতুর্থ স্তম্ভ’ হলেও, বাংলাদেশের মতো দেশে এখন তা ভেঙে পড়ছে অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রে ও রাজনৈতিক মদতে।
বাংলাদেশে এখন সত্যিকারের সাংবাদিকতা টিকে থাকা চ্যালেঞ্জের মুখে।
একদিকে অভিজ্ঞদের বিতাড়ন, অন্যদিকে অপেশাদার ও রাজনৈতিক অনুপ্রবেশের কারণে সাংবাদিকতা আজ গভীর সংকটে।
গণমাধ্যম যখন নিজেরা অপমানিত, নির্ভরযোগ্যতার সংকটে, তখন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রও আর সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না।
এখন সময় হয়েছে স্বাধীন সাংবাদিকতা রক্ষা ও পুনর্গঠনের জন্য একটি জাতীয় আলোচনার, যেটি সরকার, সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ—সবার অংশগ্রহণে সম্ভব।
