লন্ডনে ইউনূস-তারেক বৈঠকের পর করিডোর ইস্যুতে বিএনপির অবস্থান ঘিরে উঠছে নতুন প্রশ্ন। করিডোর ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা নিয়ে বিএনপির পূর্বেকার অবস্থান কি বদলে গেল? বিশ্লেষণ জানুন এখানে।

লন্ডনে অস্থায়ী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যকার এক ঘণ্টা পঁচিশ মিনিটের বৈঠক ঘিরে দেশ-বিদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক ধরনের তোলপাড় শুরু হয়েছে।
এই বৈঠকের ঠিক আগে ও পরে যেভাবে করিডোর এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমানকে সামনে এনে উপস্থাপন করা হয়েছে, তাতে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, এটি ছিল বিএনপিকে ধোঁয়াশায় রেখে একটি নীরব সমর্থন আদায়ের কৌশল—বিশেষ করে রোহিঙ্গা করিডোর ও চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের মতো স্পর্শকাতর জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যুতে
অল্প কিছুদিন আগেও করিডোর ইস্যুতে বিএনপি ছিল সরব, সরাসরি ড. খলিলুর রহমানের পদত্যাগ দাবি করেছিল এবং করিডোর পরিকল্পনাকে জাতীয় স্বার্থবিরোধী বলে অভিহিত করেছিল। এমনকি ঢাকায় করিডোর বিরোধী আন্দোলনের ডাকও এসেছিল দলটির পক্ষ থেকে।
কিন্তু লন্ডনে সেই ড. খলিলুর রহমানই যখন তারেক রহমানকে স্বাগত জানান এবং বৈঠকের পর সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির পক্ষ থেকে বক্তব্য রাখেন—তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, বিএনপির পূর্বঘোষিত অবস্থান কি হঠাৎ বদলে গেল?
বহু রাজনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, এটি ছিল ড. ইউনূসের একপ্রকার ‘কৌশলগত ভেল্কি’। বিএনপিকে বিভ্রান্ত করে করিডোর ইস্যুতে নীরব সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করা হয়েছে। এর পেছনে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:
খলিলুর রহমানের উপস্থিতি: বিএনপির ঘোরতর বিরোধিতার মুখে থাকা ব্যক্তিকে বৈঠকে প্রধান আলোচক হিসেবে তুলে ধরা এবং সংবাদ সম্মেলনে তাকে মুখপাত্র বানানো, একপ্রকার রাজনৈতিক বার্তা বহন করে।
নির্বাচনের শর্ত: বৈঠকে রমজানের আগেই নির্বাচনের সম্মতি দেওয়া হলেও তা একগুচ্ছ শর্তে বেঁধে ফেলা হয়েছে। এটি মূলত দীর্ঘসূত্রতা তৈরির কৌশল বলেই অনেকে মনে করছেন।
বিএনপির অন্তর্দ্বন্দ্ব: লন্ডনের বৈঠক নিয়ে বিএনপির অভ্যন্তরেই চলছে নানা রকম অসন্তোষ। বিশেষ করে তারেক রহমানের অংশগ্রহণ এবং করিডোর ইস্যুতে দলের অবস্থান পরিবর্তন নিয়ে নেতাদের বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
বৈঠকের আগের দিনই অস্থায়ী সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী হঠাৎ ঘোষণা দেন—তারেক রহমান চাইলে দেশে ফিরতে পারবেন। অথচ দশ মাস ধরে তাঁর দেশে ফেরার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। বিশ্লেষকরা এটিকে একপ্রকার ‘সফট ব্ল্যাকমেইল’ হিসেবেই দেখছেন।
চ্যাথাম হাউজে বক্তৃতায় ড. ইউনূস বাংলাদেশের ভোটারদের ‘টাকার বিনিময়ে ভোট দেওয়া’ বলে উল্লেখ করেন, যা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এক ধরনের অসম্মান হিসেবেই দেখা হয়। কিন্তু একদিনের ব্যবধানে তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠকে তিনি আবার নির্বাচন আয়োজনের ইঙ্গিত দেন—এই ইউ-টার্নও প্রশ্নবিদ্ধ।
বিএনপির অনেক নেতা মনে করছেন, করিডোর ও বন্দর ইস্যুতে নীরবতা এবং খলিলুর রহমানের সঙ্গে প্রকাশ্য সংলাপ দলের দীর্ঘদিনের অবস্থানকে বিপরীতমুখী করে ফেলেছে।
এক জ্যেষ্ঠ নেতা মন্তব্য করেন, ‘যে ব্যক্তিকে আমরা ষড়যন্ত্রকারী বলেছিলাম, তাকেই যদি মুখ্য আলোচক বানাই, তাহলে জনগণের সামনে আমরা বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবো।’
ড. ইউনূস সম্ভবত তার রাজনৈতিক চতুরতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত বিজয় অর্জনের চেষ্টা করেছেন। কিন্তু এই সফলতা দীর্ঘস্থায়ী হবে কি না, তা নির্ভর করছে বিএনপির পরবর্তী অবস্থান এবং জনমানসে এই আচরণের প্রতিক্রিয়ার ওপর। করিডোর প্রশ্নে যদি বিএনপি চুপ থাকে কিংবা নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন করে, তাহলে দলের ওপর ‘জাতীয় স্বার্থবিরোধী আপস’ করার অভিযোগ জোরালো হতে বাধ্য।
