গরুর চামড়া বিক্রি না হওয়ার পেছনে ভারতের নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক বাজার সংকট ও দেশীয় চামড়া ব্যবসার পতনের যৌথ প্রভাব কীভাবে কাজ করেছে, তার বিশ্লেষণ।

বাংলাদেশের কোরবানির ঈদ মানেই একবারে বিপুল পরিমাণ গরু-ছাগলের চামড়া সংগ্রহের মৌসুম। বছরের এই একটি সময়েই ট্যানারি খাত মূলধনের জোগান পায়। কিন্তু ২০২৫ সালে ঈদুল আজহার পর বাজারে চামড়া পড়ে থাকলো—কোথাও বিক্রি হলো না, কোথাও আবার আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হলো। প্রশ্ন উঠে: কেন?
এই প্রশ্নের জবাবে আসলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতি, বৈদেশিক নির্ভরতা, এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কাঠামোর দুর্বলতা মিলেমিশে এক জটিল চিত্র আঁকে। এর নামই আমরা দিয়েছি—“ইন্ডিয়া এফেক্ট”।
বাংলাদেশের লেদার ইন্ডাস্ট্রির বড় অংশ কাঁচামাল হিসেবে ঈদের সময় সংগৃহীত গরু-ছাগলের চামড়ার উপর নির্ভর করে। এসব চামড়া প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পর রপ্তানি করা হতো ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং ভারতের মতো দেশে।
কিন্তু এবার সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়েছে ভারতের সাথে চামড়া রপ্তানিতে। ভারত নিজের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নীতির কারণে বাংলাদেশ থেকে কাঁচা বা প্রক্রিয়াজাত চামড়া আমদানির অনুমতি বন্ধ রেখেছে। শুধু তাই নয়, ভারতের মাধ্যমে যেসব কন্টেইনার অন্য দেশে যেত (যেমন: ভারত হয়ে ভিয়েতনামে), সেই মধ্যস্থ শিপমেন্টও স্থগিত।
বাংলাদেশের চামড়াশিল্প মূলত সাভারের ট্যানারিগুলোকে ঘিরেই আবর্তিত হয়। কিন্তু এই ট্যানারিগুলো বর্তমানে অনেকাংশে অচল।
- বহু ব্যবসায়ী ঋণের সুদ পরিশোধে অক্ষম হয়ে পড়েছেন।
- আগুন লাগা, কারখানা বন্ধ হওয়া এবং কাঁচামালের সংকট—সব মিলিয়ে উৎপাদন থমকে গেছে।
- অনেক ব্যবসায়ী ঈদের চামড়া কিনে প্রক্রিয়াজাত করার মতো সক্ষমতা হারিয়েছেন। ফলে সংগ্রহ করা হয়নি, বিক্রিও হয়নি।
এ অবস্থায় অনেকেই বাজারে চামড়া ফেলে দিয়েছেন বা জ্বালিয়ে দিয়েছেন।
প্রতিবারই ঈদের সময় লবণ সংকটের অজুহাত দিয়ে চামড়া নষ্ট হওয়ার খবর প্রচার পায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে লবণ নয়, চাহিদাহীনতা ও নগদ টাকার অভাবই চামড়া বিক্রি না হওয়ার মূল কারণ। এবারও সেই একই চিত্র: চামড়া সংগ্রহের পর তা বিক্রি বা প্রক্রিয়াজাত করার ক্রেতা নেই।
ঈদের সময় সংগৃহীত পশুর চামড়া থেকে প্রতিবছর গড়ে ১০০-১৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় হতো। এবার তা প্রায় শূন্যের কোটায়। ফলে ট্যানারি খাত ও রপ্তানি আয়—দুটিই মুখ থুবড়ে পড়েছে।
চামড়া ব্যবসার এই ধস থেকে উৎপন্ন ধাক্কা:
- শ্রমিক ছাঁটাই
- ব্যাংকিং খাতের ক্ষতিগ্রস্ত ঋণ
- রপ্তানি কমে যাওয়া
- অর্থনীতিতে একটি মৌসুমি কিন্তু গুরুতর সংকট
বিকল্প বাজার তৈরি করা: ভারত নির্ভরতা কমাতে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়ার মতো দেশে সরাসরি রপ্তানি চ্যানেল খুলতে হবে।
ট্যানারি আধুনিকীকরণ: প্রাথমিক প্রক্রিয়াজাতকরণ যেন আরও দক্ষতার সঙ্গে স্থানীয়ভাবে হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
আর্থিক সহায়তা: সরকারি ব্যাংক থেকে নিম্ন সুদে ঋণ দিতে হবে ট্যানারি খাতে।
বাজার সংরক্ষণ: ঈদের সময় চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের জন্য ভ্রাম্যমাণ কোল্ড চেম্বার বা লবণ প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট চালু করা যেতে পারে।
চামড়া বিক্রি না হওয়ার পেছনে ভারতের নিষেধাজ্ঞা একটি বড় কারণ হলেও দেশের অভ্যন্তরীণ অদক্ষতা ও অব্যবস্থাপনাও দায়ী। প্রতি বছর একই চিত্র, কিন্তু কোনো সমাধান নেই। তাই এবার সময় এসেছে—বহির্ভরতা কাটিয়ে নিজস্ব সক্ষমতা গড়ে তোলার। নয়তো চামড়া যেমন পুড়ছে, তেমনি পুড়বে বাংলাদেশের সম্ভাবনাও।
