বাংলাদেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার এখন জাতীয় সংকটে পরিণত। সীমান্ত পয়েন্ট, রোহিঙ্গা শিবির, শহরের হাট থেকে শুরু করে পুলিশের জড়িত থাকার অভিযোগ—সব কিছু তুলে ধরা হয়েছে এই বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশে মাদক এখন আর সীমান্তবর্তী অঞ্চলের সীমাবদ্ধ কোনো সমস্যা নয়—এটি হয়ে উঠেছে একটি জাতীয় সংকট। কক্সবাজার, বান্দরবান, সিলেট থেকে শুরু করে নারায়ণগঞ্জ, সাভার, মুন্সীগঞ্জ কিংবা নরসিংদী—প্রায় প্রতিটি জেলা এখন মাদক পাচার, বেচাকেনা ও সেবনের ছোবলে আক্রান্ত। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযান, মামলার সংখ্যা এবং জব্দকৃত মাদকের পরিমাণ রেকর্ড ছুঁলেও থামেনি এই ভয়াল ব্যবসা।
২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ডিএনসি, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি ও কোস্ট গার্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী:
- মোট ১১,৫২,৫৯৫টি মাদক মামলা
- গ্রেপ্তার ১৪,৬২,৭৭৯ জন
- ৩৮ কোটি ৭৮ লাখ ইয়াবা, ৪৫২৮ কেজি হেরোইন, ১৯৫ কেজি কোকেন এবং ৩৬৯ কেজি আফিম জব্দ
তবে প্রকৃত চিত্র আরও ভয়াবহ। কেননা, একবার জামিন পেলেই অধিকাংশ অপরাধী ফের জড়িয়ে পড়ছে মাদক কারবারে। রাজনৈতিক নেতাদের জড়িত থাকার অভিযোগ, পুলিশি মাসোহারা গ্রহণ এবং প্রযুক্তিনির্ভর মাদকের ছড়াছড়ি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
টেকনাফ ও উখিয়ার রোহিঙ্গা শিবির এখন শুধু মানবিক সংকট নয়, বরং দেশে ইয়াবার সবচেয়ে বড় ডিপো। বিজিবি ও কোস্ট গার্ড বলছে, মিয়ানমার থেকে আসা পাচারকারীদের ৮০ শতাংশই রোহিঙ্গা। এসব শিবির থেকেই চালান যাচ্ছে চট্টগ্রাম হয়ে ঢাকাসহ দেশের সব অঞ্চলে।
চট্টগ্রাম: ১৮টি সীমান্ত পয়েন্ট দিয়ে ইয়াবা ও আইস ঢুকছে, রেল ও বাসে চলছে দেশের অভ্যন্তরে সরবরাহ।
নারায়ণগঞ্জ: শুধু শহরেই ২০টি হাটে চলছে খোলামেলা বেচাকেনা।
সাভার-আশুলিয়া: তিন শতাধিক স্থানে খুচরা বিক্রি, রয়েছে শত শত সশস্ত্র বাহিনীসহ ডিলার চক্র।
মুন্সীগঞ্জ: প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে মাদক ব্যবসার জাল।
সিলেটে ৯০ শতাংশ মাদক লেনদেন এখন ক্যাশলেস। মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে চালান যাচ্ছে হাতে হাতে। সীমান্ত দিয়ে আসছে ভারতীয় ফেনসিডিল ও গাঁজা।
নরসিংদীতে পুলিশ কর্মকর্তারাই মাদক পাচারে সরাসরি যুক্ত—এমন অভিযোগে ডিবির ওসি ও আদালতের ইন্সপেক্টরকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। এই ঘটনা পুরো দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার ওপর এক বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
বিগত কয়েক মাসে সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ এবং বিজিবির সমন্বয়ে চালানো বেশ কিছু অভিযান আশার আলো দেখিয়েছে। কালিয়া, পেকুয়া, টেকনাফসহ বিভিন্ন স্থানে চিহ্নিত মাদক কারবারিদের গ্রেপ্তার, মাদক জব্দ এবং স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা পরিস্থিতিকে আংশিক নিয়ন্ত্রণে আনছে।
বাংলাদেশের এই ভয়াবহ মাদক সংকটকে শুধু আইনশৃঙ্খলার ইস্যু হিসেবে দেখলে হবে না। এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং তারুণ্যের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত ইস্যু। রোহিঙ্গা শিবির থেকে সীমান্ত অঞ্চল, শহর থেকে গ্রাম, পুলিশ থেকে রাজনীতিবিদ—সবার দায় নিরপেক্ষভাবে নির্ধারণ করে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এ সংকট মোকাবেলা না করলে এক সময় তা হবে দেশের অস্তিত্ব সংকট।
