২০২৫ সালের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে না ৪ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী। ২০২৪ সালের ‘জুলাই আন্দোলন’-এর কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা ও সহিংসতার প্রভাবেই কি এই বিপুল ঝরে পড়া? বিশ্লেষণে খুঁজে দেখুন বাস্তবতা।
২০২৫ সালের এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছেন না ৪ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী—এ তথ্য শুধু পরিসংখ্যান নয়, একটি বিপর্যয়ের দলিল। আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের হালনাগাদ তথ্য বলছে, ২০২৩ সালের এসএসসি পাস করা প্রায় ১৬ লাখ ৪১ হাজার শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৪ লাখ ৮৩ হাজার একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এইচএসসি পরীক্ষায় ফরম পূরণ করেছেন মাত্র ১০ লাখ ৫০ হাজার। এর মানে, একনজরে প্রায় ২১ শতাংশ শিক্ষার্থী ‘সিস্টেম’ থেকে ঝরে পড়েছে।
কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধান করলেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে ২০২৪ সালের ‘জুলাই আন্দোলন’ নামক ঐ সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা। যে আন্দোলন শুরু হয়েছিল সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে, তা ক্রমেই রূপ নেয় রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে তীব্র সঙ্ঘাতে।
এই আন্দোলনের জেরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ, ক্লাস-পরীক্ষা স্থগিত, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাহীনতা এবং রাজনৈতিক সহিংসতার মধ্য দিয়ে শিক্ষাজীবন এক অনিশ্চয়তায় পড়েছিল।
২০২৪ সালের জুন থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান মূলত ‘বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলন’ ব্যানারে সংগঠিত হলেও, জুলাই মাসে এসে তা নানাভাবে ব্যবহৃত হয় রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপূরণে।
সরকার পতনের আহ্বান, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে স্লোগান, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লক্ষ্য করে হামলা এবং পাল্টা অভিযান—এইসবই শিক্ষার্থীদের মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত করে।
ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, “অসংখ্য শিক্ষার্থী আন্দোলনে সরাসরি অংশ নেয়। অনেকে আহত হয়, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়, পরিবারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পড়াশোনায় ফিরে যাওয়া তাদের জন্য বাস্তবিক অর্থেই কঠিন হয়ে ওঠে।”
বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ শিক্ষাবোর্ডে ঝরে পড়ার হার কিছুটা কম হলেও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে তা ৩৯.৯৬ শতাংশ এবং মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৩৮.৬৪ শতাংশে পৌঁছেছে।
এই দুটি খাতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মূলত নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিনিধিত্ব বেশি, যাদের শিক্ষাজীবনে বিঘ্ন মানেই জীবনের গতিপথ বদলে যাওয়া।
এইচএসসি পরীক্ষার্থী তাসনিয়া স্বর্ণা জানায়, “আন্দোলনের সময় আমরা কলেজে যেতে পারিনি। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পড়াশোনা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছি।”
তার মতো হাজারো শিক্ষার্থীর গল্প আজ চাপা পড়ে আছে।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেন, “এই ধরনের অস্থিরতা শুধু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা নয়, মানসিক স্বাস্থ্যেও গভীর ক্ষতি করে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পুনঃপ্রবেশের সুযোগ তৈরি না করলে আমরা একটি ‘হারানো প্রজন্ম’ তৈরি করছি।”
তিনি আরও বলেন, “সরকারকে এখনই তিনটি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে:
১. মানসিক পুনর্বাসন সেবা
২. নিরাপদ শিক্ষাপরিবেশ নিশ্চিতে কঠোর ব্যবস্থা
৩. বিকল্প ও পুনরুদ্ধারমূলক শিক্ষা মডেল চালু করা”
শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ঝরে পড়া রোধে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের চিন্তা চলছে। তবে এখনই এমন একটি জাতীয় পর্যায়ের পুনর্বাসন উদ্যোগ প্রয়োজন, যেখানে একদিকে থাকবে বিনামূল্যে বিশেষ কোচিং, অন্যদিকে মানসিক সহায়তা ও প্রয়োজনীয় ফিনান্সিয়াল ইনসেনটিভ।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিহিত। ‘জুলাই আন্দোলন’-এর বাস্তবতা এবং তার প্রভাবকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। আমরা যদি এখনই উদ্যোগ না নেই, তাহলে এই ৪ লাখ ৩৩ হাজার শিক্ষার্থী শুধু পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকবে না—তারা হয়ে উঠবে আমাদের অবহেলিত অতীতের উদাহরণ।
