বীর নারী মুক্তিযোদ্ধা সখিনা বেগমের মৃত্যুতে জাতি হারালো এক দুর্ধর্ষ যোদ্ধাকে, যিনি দা দিয়ে রাজাকার হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়েছিলেন। তার জীবন ইতিহাসে জায়গা করে নিয়েছে অনন্য বীরত্বের গল্প।
যেসব নারী মুক্তিযুদ্ধের সময় রণাঙ্গনে অস্ত্র হাতে লড়াই করে প্রতিরোধের এক নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন সখিনা বেগম। ১৭ জুন ভোরে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে ৯২ বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তার মৃত্যুতে নিভে গেল এক জ্বলন্ত চেতনার দীপ্ত শিখা। তিনি ছিলেন এমন একজন, যিনি শুধু রান্না করেই মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেননি, প্রতিশোধের আগুনে নিজ হাতে পাঁচ রাজাকারকে হত্যা করে হয়ে উঠেছিলেন প্রতীকী প্রতিরোধের মুখ।
১৯৭১ সালে ভাগনে মতিউর রহমান শহিদ হওয়ার পর সখিনার মনে জন্ম নেয় প্রতিশোধের আগুন। সে আগুন ছিল ন্যায়ের দাবিতে জ্বলন্ত প্রতিবাদ। গুরুই এলাকায় ‘বসু বাহিনীর’ ক্যাম্পে রান্নার কাজ করলেও তিনি ছিলেন গোপনচর। হঠাৎ একদিন ধরা পড়েন হানাদার বাহিনীর হাতে। সেখান থেকে পালিয়ে আসার সময় তিনি সাথে নিয়ে আসেন একটি ধারালো দা—যা পরবর্তীতে হয়ে ওঠে পাঁচ রাজাকারের মৃত্যুদণ্ডের যন্ত্র। এই ঘটনাটি কেবল একটি দা দিয়ে রাজাকার হত্যা করার গল্প নয়, এটি নারী প্রতিরোধ ও আত্মবিসর্জনের সাহসিকতার চরম নিদর্শন।
যে দা দিয়ে তিনি রাজাকার হত্যা করেছিলেন, সেটি আজ ঢাকার মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে সংরক্ষিত। দার নিচে খোদাই করা আছে তাঁর নাম—সখিনা বেগম। এই নাম ইতিহাসের পাতায় লেখা এক সোনালি অধ্যায়। এটা শুধুই অস্ত্র নয়, বরং নারীর প্রতিবাদ, প্রতিশোধ ও প্রতিরোধের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
সখিনা বেগম নিঃসন্তান ছিলেন, কিন্তু তার মাতৃত্ব ছড়িয়ে পড়েছিল সমগ্র জাতির ওপর। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তাকে আগলে রেখেছিলেন ভাগনি ফাইরুন্নেছা আক্তার। রাষ্ট্র তাকে ভুলে যায়নি—তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করার প্রস্তুতি নিয়েছে প্রশাসন।
তাকে নিয়ে কোনো পত্রিকার প্রধান শিরোনাম হয়তো হয়নি, কিন্তু ইতিহাসের প্রতিটি পাতায় তিনি আছেন—একজন নীরব নায়িকা হিসেবে।
আজ যখন জাতি একে একে হারাচ্ছে ১৯৭১ সালের জীবন্ত ইতিহাসগুলোকে, তখন সখিনা বেগমের চলে যাওয়া মনে করিয়ে দেয় এক কঠিন বাস্তবতা—আমরা হারিয়ে ফেলছি সাহস, প্রতিরোধ আর আত্মত্যাগের সেই প্রতীকদের, যাদের কাছে আমরা ঋণী চিরকাল।
তাঁর মৃত্যুতে শুধু একজন মুক্তিযোদ্ধা হারাইনি, হারিয়েছি একটি জীবন্ত ইতিহাস, এক টুকরো বাংলাদেশকে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা সখিনা বেগমের প্রয়াণে আমরা মাথা নিচু করে গভীর শ্রদ্ধা জানাই। আমাদের উচিত এই মহিয়সী নারীর জীবনগাথা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে শেখানো—একজন নারী কীভাবে ইতিহাস বদলে দিতে পারেন।
