২০১১ সালে ড. ইউনূস যখন গ্রামীণ ব্যাংক থেকে অপসারণের মুখে, তখন বিতর্কিত পিআর ফার্ম বার্সন-মার্স্টেলারকে নিয়োগ দেন। এই কলামে উঠে এসেছে ইউনূসের পিআর কৌশল, তথ্য নিয়ন্ত্রণের দক্ষতা এবং তার রাজনৈতিক পরিণতি।
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় পাবলিক রিলেশনস (পিআর) ফার্মগুলোর অন্যতম বার্সন-মার্স্টেলার (বি-এম) দীর্ঘদিন ধরে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে। মানবাধিকার লঙ্ঘন, নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ প্রচারণা এবং স্বৈরশাসকদের পক্ষে কাজ করার অভিযোগ এই ফার্মের সঙ্গে জড়িত। ২০১১ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই কুখ্যাত ফার্মের সঙ্গে কাজ করেছিলেন তাঁর সুনাম ও ইমেজ পুনরুদ্ধারের জন্য, যখন তিনি গ্রামীণ ব্যাংকের নেতৃত্ব থেকে অপসারণের মুখোমুখি হয়েছিলেন।
এছাড়া, ড. ইউনূস অত্যন্ত সফলভাবে তাঁর সম্পর্কিত সংবেদনশীল তথ্যাদি ইন্টারনেট থেকে গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছেন, যার পিছনে কাজ করছে একটি বড় ও দক্ষ পিআর এবং টেক টিম। এই প্রতিবেদনে বি-এম-এর বিতর্কিত ইতিহাস, ইউনূসের এই ফার্মের ব্যবহার এবং তাঁর তথ্য নিয়ন্ত্রণের কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হবে।
বার্সন-মার্স্টেলারের বিতর্কিত ইতিহাস
১৯৫৩ সালে হ্যারল্ড বার্সন এবং উইলিয়াম মার্স্টেলার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বার্সন-মার্স্টেলার বিশ্বব্যাপী পিআর শিল্পে একটি প্রভাবশালী নাম। তবে, এই ফার্মের কার্যক্রম বারবার নৈতিক ও মানবাধিকার সংক্রান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এমএসএনবিসি টেলিভিশনের সামাজিক সমালোচক রাচেল ম্যাডোর মন্তব্যে এই ফার্মের কুখ্যাতি স্পষ্ট:
“যখন মন্দের পাবলিক রিলেশনসের প্রয়োজন হয়, তখন মন্দের জন্য বার্সন-মার্স্টেলার স্পিড-ডায়ালে থাকে।”
নিম্নে বি-এম-এর কিছু উল্লেখযোগ্য বিতর্ক উল্লেখ করা হলো:
১. থ্রি মাইল আইল্যান্ড পারমাণবিক দুর্ঘটনা (১৯৭৯): মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ডে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে মেল্টডাউনের পর বি-এম এই কেন্দ্রের অপারেটরের জন্য পিআর পরিচালনা করে, যা বিশ্বের গুরুতর পারমাণবিক দুর্ঘটনাগুলোর একটি।
২. মার্কিন তামাক শিল্প: বি-এম তামাক শিল্পের পক্ষে ‘ন্যাশনাল স্মোকার্স অ্যালায়েন্স’ সংগঠিত করে, ধূমপানের স্বাস্থ্য ঝুঁকি হালকা করার প্রচেষ্টায়, যা ব্যাপক সমালোচিত হয়।
৩. আর্জেন্টিনার সামরিক স্বৈরশাসন: ১৯৭০-এর দশকে আর্জেন্টিনার সামরিক জান্তা, যারা ৩৫,০০০ মানুষের গুম ও হত্যার জন্য দায়ী, তাদের ইমেজ উন্নত করতে বি-এম নিয়োগ করেছিল।
৪. পূর্ব তিমুরে গণহত্যা: ইন্দোনেশিয়ার শাসনব্যবস্থা, যারা পূর্ব তিমুরে গণহত্যা সংঘটিত করেছিল, তাদের জন্য বি-এম পিআর কার্যক্রম পরিচালনা করে।
৫. ভোপাল গ্যাস বিপর্যয় (১৯৮৪): ভারতের ভোপালে ইউনিয়ন কার্বাইডের গ্যাস বিপর্যয়ে হাজার হাজার মানুষের মৃত্যু ও ক্ষতির পর বি-এম এই কোম্পানির পক্ষে কাজ করে, যা ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে।
৬. নাইজেরিয়ার বিয়াফ্রা যুদ্ধ: ১৯৬০-এর দশকে নাইজেরিয়া সরকার বিয়াফ্রা যুদ্ধের সময় গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করতে বি-এম-কে নিয়োগ করে।
৭. রোমানিয়ার স্বৈরশাসক ও সৌদি রাজপরিবার: রোমানিয়ার স্বৈরশাসক নিকোলাই সিউসেস্কু এবং সৌদি রাজপরিবারের জন্য ইমেজ উন্নত করার কাজ করে বি-এম, যা মানবাধিকার কর্মীদের কাছে সমালোচিত।
৮. ফেসবুকের বিরুদ্ধে গুগলের নিন্দা প্রচারণা (২০১১): বি-এম ফেসবুকের পক্ষে গুগলের বিরুদ্ধে গোপন নিন্দা প্রচারণা চালায়, যা প্রকাশিত হলে কেলেঙ্কারির সৃষ্টি করে। ফার্মটি স্বীকার করে তাদের দুই সাবেক সাংবাদিক এই কাজে জড়িত ছিলেন।
৯. ইজিপ্টের পর্যটন মন্ত্রণালয় (১৯৯৩): মিশরে সন্ত্রাসী হামলার পর পর্যটন শিল্পের ক্ষতি কমাতে বি-এম প্রচারণা চালায়, যা নৈতিক প্রশ্ন তুলেছিল।
১০. ইউনাবোমার হামলা (১৯৯৪): বি-এম-এর নির্বাহী থমাস মসার “ইউনাবোমার” টেড ক্যাজিনস্কির মেইলবোমা হামলায় নিহত হন। ক্যাজিনস্কি বিশ্বাস করতেন বি-এম এক্সন ভালডেজ তেল ছড়ানোর সময় এক্সনের সঙ্গে কাজ করেছিল।
এই ঘটনাগুলো বি-এম-এর নৈতিক মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে, এবং ফার্মটিকে প্রায়শই “মন্দের পিআর” পরিচালনার জন্য সমালোচিত করা হয়।
ড. ইউনূস এবং বার্সন-মার্স্টেলার: সুনাম পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা
২০১১ সালে গ্রামীণ ব্যাংকের নেতৃত্ব থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অপসারণের সময় তিনি তাঁর ইমেজ ও জনপ্রিয়তা পুনরুদ্ধারের জন্য বার্সন-মার্স্টেলারের সঙ্গে কাজ করেন।
এই সময়ে বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার, ইউনূসের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম এবং উচ্চ সুদের হার চাপানোর অভিযোগ তুলেছিল।
নরওয়েজিয়ান টেলিভিশনের ডকুমেন্টারি ‘কট ইন মাইক্রো ডেট’ গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ১০০ মিলিয়ন ডলার অনিয়মিতভাবে স্থানান্তরের অভিযোগ তুলে ধরে, যা ইউনূসের সুনামের উপর গভীর প্রভাব ফেলে।
এই সংকট মোকাবিলায় ড. ইউনূস বি-এম-এর সঙ্গে যুক্ত হন। ফেব্রুয়ারি ২০১১-এ, আয়ারল্যান্ডের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট এবং ফ্রেন্ডস অফ গ্রামীণের প্রধান মুখ মেরি রবিনসন বি-এম-এর সঙ্গে ইউনূসের পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করেন।
এই প্রচেষ্টার লক্ষ্য ছিল অভিযোগগুলো প্রশমিত করা এবং ইউনূসের আন্তর্জাতিক ইমেজ পুনরুদ্ধার করা। তবে, এই প্রচেষ্টা সফল হয়নি, কারণ মার্চ ২০১১-এ সরকার ইউনূসকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে বরখাস্ত করে।
বি-এম-এর সঙ্গে ইউনূসের সম্পর্ক বিতর্কিত হয়েছিল কারণ এই ফার্মের অতীত কার্যক্রম তাঁর মাইক্রোফাইন্যান্সের মাধ্যমে দারিদ্র্য দূরীকরণ ও নারী ক্ষমতায়নের লক্ষ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ছিল। সমালোচকদের মতে, এমন একটি ফার্মের সঙ্গে কাজ করা ইউনূসের নৈতিক অবস্থানের উপর প্রশ্ন তুলেছিল।
ইন্টারনেটে তথ্য নিয়ন্ত্রণে ইউনূসের দক্ষতা
ড. ইউনূস শুধু পিআর ফার্মের উপর নির্ভর করেননি, তিনি অত্যন্ত সফলভাবে তাঁর সম্পর্কিত সংবেদনশীল তথ্যাদি ইন্টারনেট থেকে গোপন রাখতে সক্ষম হয়েছেন। এই কাজে তাঁর পিছনে কাজ করছে একটি বড় এবং দক্ষ পিআর ও টেক টিম।
এই টিম সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন (এসইও), কনটেন্ট মডারেশন এবং ডিজিটাল মিডিয়া ম্যানেজমেন্টের মাধ্যমে ইউনূসের বিরুদ্ধে সমালোচনামূলক তথ্যের প্রচার সীমিত করেছে।
সামাজিক মাধ্যমে নেতিবাচক পোস্ট দ্রুত সরিয়ে ফেলা, সমালোচনামূলক নিবন্ধের দৃশ্যমানতা কমানো এবং ইতিবাচক কনটেন্ট প্রচারের মাধ্যমে এই টিম তাঁর ইমেজ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
এই কৌশলের ফলে ইউনূসের বিরুদ্ধে ২০১১ সালের অভিযোগ, যেমন আর্থিক অনিয়ম বা উচ্চ সুদের হার, ইন্টারনেটে তুলনামূলকভাবে কম দৃশ্যমান।
তাঁর টেক টিম সম্ভবত উন্নত ডিজিটাল টুলস এবং অ্যালগরিদম ব্যবহার করে সার্চ ফলাফলে ইতিবাচক তথ্যকে অগ্রাধিকার দেয়, যা তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতি অক্ষুণ্ণ রাখতে সহায়ক হয়েছে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে ইউনূস এবং বি-এম
২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত, বি-এম (বর্তমানে বার্সন কোহন অ্যান্ড উলফ, যা ২০২৪ সালে হিল অ্যান্ড নোলটনের সঙ্গে মিলিত হয়ে বার্সন নামে পরিচিত) ড. ইউনূসের জন্য বর্তমানে পিআর কার্যক্রম পরিচালনা করছে কিনা, তা নিশ্চিত করার মতো কোনো প্রমাণ নেই। ২০১১ সালের সংকটের পর এই সম্পর্কের ধারাবাহিকতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে, ইউনূসের বর্তমান দক্ষ পিআর ও টেক টিম তাঁর ইমেজ এবং তথ্য নিয়ন্ত্রণে সফলভাবে কাজ করছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে তিনি বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, এবং তাঁর পাবলিক ইমেজ এখনও আন্তর্জাতিক মহলে গুরুত্বপূর্ণ।
বার্সন-মার্স্টেলারের বিতর্কিত ইতিহাস এই ফার্মকে পিআর শিল্পে একটি কলঙ্কিত নাম করে তুলেছে। ২০১১ সালে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের এই ফার্মের সঙ্গে কাজ করার সিদ্ধান্ত তাঁর সুনামের উপর নতুন প্রশ্ন তুলেছিল। তবে, তিনি শুধু পিআর ফার্মের উপর নির্ভর করেননি; তাঁর দক্ষ পিআর ও টেক টিম ইন্টারনেটে তাঁর সম্পর্কিত তথ্য নিয়ন্ত্রণে অসাধারণ দক্ষতা দেখিয়েছে। এই কৌশল তাঁর আন্তর্জাতিক ইমেজ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
