জঙ্গি দমন ও নিরাপত্তা রক্ষায় যাঁরা ছিলেন অগ্রণী, আজ তাঁরাই দুর্নীতির অভিযোগে রাষ্ট্রীয় টার্গেট। আদৌ কি এটি দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, নাকি রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভাঙার সুপরিকল্পিত চেষ্টা?
এক সময় যারা জীবন বাজি রেখে দেশ রক্ষার জন্য জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, আজ তাঁদেরই রাষ্ট্রীয় টার্গেটে পরিণত হতে হচ্ছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্প্রতি একের পর এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমেছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার জন্য মুখ্য এই ব্যক্তিরা হঠাৎ করেই হয়ে উঠেছেন তদন্তের শিকার। প্রশ্ন উঠেছে—এ কি কেবল দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানে দায়বদ্ধতা, নাকি এর আড়ালে আছে ক্ষমতার প্রতিশোধ আর ভিন্ন মত দমনের হীন কৌশল?
দুদক বলছে, তদন্ত নিয়মতান্ত্রিকভাবে চলছে। তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি ব্যাংক হিসাব জব্দ থেকে শুরু করে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে কাজ করছে। তবে অভিযোগের ধরন ও লক্ষ্যবস্তু বাছাইয়ের পদ্ধতি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
কেননা, অভিযুক্তদের অনেকেই জাতীয় নিরাপত্তা, গোয়েন্দা কৌশল এবং বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ডিজিএফআই, এনএসআই, এনটিএমসি ও বিজিবি প্রধানরা, এমনকি রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানও।
বিশ্লেষকদের ভাষ্য, একটি দেশপ্রেমিক ও অভিজ্ঞ নিরাপত্তা বলয়ের ওপর রাষ্ট্রীয় অবিশ্বাস তৈরি করার প্রয়াস চলছে। এর মধ্য দিয়ে মূলত একটি পরিকল্পিত ‘প্যারালাল কাঠামো’ প্রতিষ্ঠা করতে চায় বর্তমান অন্তর্বর্তী ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী, যেখানে রাষ্ট্রের পেশাদার কর্মকর্তা ও আদর্শিক প্রতিরোধশক্তিকে স্তব্ধ করে দেওয়া হবে।
অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহণের আগে থেকেই দেশে একাধিক কারাগার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে, যার ফলে ৭০০-এর বেশি বন্দি পালিয়ে যায়, এবং তাদের মধ্যে ৪০ জনেরও বেশি শীর্ষ সন্ত্রাসী ছিল। সেই সময় ৫০০টিরও বেশি থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট করা হয়, আর একের পর এক পুলিশ সদস্য হামলার শিকার হন।
এমন বাস্তবতায় জঙ্গি দমনকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করাটা রাষ্ট্রীয় নীতির এক সাংঘাতিক দ্বিচারিতা বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শুধুমাত্র আগস্ট ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে পুলিশের ওপর ২২৫টি হামলা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ৭০টি ছিল বড় ধরনের। একইসঙ্গে চলতে থাকে পুলিশি অভিযানে বাধা দেওয়া, আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা এবং পুলিশের ওপর মব অ্যাটাক। প্রতিদিন গড়ে একটি করে হামলার শিকার হয়েছে পুলিশ।
এই পরিস্থিতিকে অনেকেই বলছেন "রাষ্ট্রের মধ্যে আরেক রাষ্ট্র" গঠনের প্রাথমিক ধাপ। যেখানে আইনের শাসন থাকবে নির্বাচন, সংসদ কিংবা বিচারপতির অধীন নয়—বরং হবে কিছু বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত গোষ্ঠীর নির্দেশনায় নিয়ন্ত্রিত।
এর ফলে দুর্নীতির দায়ে বিচার নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার প্রকৃত রক্ষকদের নিঃশেষ করাই হয়ে উঠেছে প্রধান টার্গেট।
বিশেষজ্ঞদের মত, আজ যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছেন, তাদের সম্মানহানি ও মনোবল ভাঙার যে প্রক্রিয়া চলছে, তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের গোড়ায় কুঠারাঘাত করবে।
অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, বাহিনীর আত্মবিশ্বাস ও আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা—সবই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর তদন্ত হোক, এটি জাতির সব অংশেরই দাবি। তবে তা হতে হবে উদ্দেশ্যহীন ও রাজনৈতিক প্রতিশোধ থেকে মুক্ত। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আস্থা রক্ষাকারীদের বিরুদ্ধে সম্মানহানিকর অভিযান চালিয়ে যদি নিরাপত্তার কাঠামোই দুর্বল করে দেওয়া হয়, তাহলে দুর্নীতির বিচার নয়, বরং রাষ্ট্র ভাঙার এক সুপরিকল্পিত চক্রান্তের বাস্তবায়নই হবে নিশ্চিত।
দেশ আজ এক রাজনৈতিক, আদর্শিক ও নিরাপত্তাগত সংকটকাল অতিক্রম করছে। এমন সময় পেশাদার বাহিনীর শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর চাপে রাষ্ট্র যেন নিজের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছে নিজেই। এই পথে চললে ক্ষতিগ্রস্ত হবে রাষ্ট্র, জনগণ ও সার্বভৌমত্ব—সবচেয়ে বড় কথা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপদ ভবিষ্যৎ।
