রাখাইন সংঘাত ঘিরে রোহিঙ্গাদের জন্য প্রস্তাবিত মানবিক করিডোর নিয়ে তীব্র রাজনৈতিক বিতর্ক। তারেক রহমান, ড. ইউনূস ও ড. খলিলুর রহমানের গোপন বৈঠক কি এই পরিকল্পনার পেছনে?
রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে আবারও সেনা অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই আন্তর্জাতিক মহলে ‘মানবিক করিডোর’ গঠনের প্রস্তাব আলোচনায় আসে। এই করিডোর গঠনের সম্ভাব্য কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের পরিকল্পনা রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন ঝড় তোলে। সরকারের পক্ষ থেকে বিষয়টি মানবিক চাহিদা পূরণের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হলেও, বিএনপির সাম্প্রতিক অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ বার্তার মধ্যে সাংঘর্ষিকতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিএনপি একদিকে মানবিক করিডোরের বিরুদ্ধে জোরালো অবস্থান নিচ্ছে। দলটির নেতারা বলছেন, এটি বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার জন্য বিপজ্জনক। ঢাকায় আয়োজিত এক বিশাল সমাবেশে দলীয় নেতারা ‘জাতীয় নিরাপত্তা বাঁচাও’ স্লোগান তুলে আন্দোলনের ডাক দেন।
কিন্তু হঠাৎ করেই রাজনৈতিক আবহ পাল্টে দেয় একটি সংবাদ: লন্ডনে গোপনে দেখা করেন তারেক রহমান, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা ড. খলিলুর রহমান এবং ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই বৈঠক নিয়ে বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর কোনো মন্তব্য না করলেও অভ্যন্তরীণ সূত্র বলছে, ‘মানবিক করিডোরের আন্তর্জাতিক ফ্রেমওয়ার্ক’ তৈরিতে বিএনপির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতা চলছে।
ড. ইউনূস এবং ড. খলিলুর রহমানের অতীত ঘনিষ্ঠতা, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর সাথে তাদের সংযোগ—সব কিছু মিলিয়ে এই বৈঠক সহজ একটি ‘কথোপকথন’ বলে মেনে নেওয়া যাচ্ছে না।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখানে একটি গভীর গেম চলছে, যার মূল লক্ষ্য হলো—
- রোহিঙ্গা সংকটে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা
- জাতীয় নির্বাচনের আগে আন্তর্জাতিক ম্যান্ডেট সৃষ্টির চেষ্টা
- বর্তমান সরকারের প্রতিপক্ষদের দিয়ে নরম পররাষ্ট্রনীতি বাস্তবায়ন
চট্টগ্রাম বন্দরের কৌশলগত অবস্থান রোহিঙ্গা করিডোর ইস্যুকে জটিল করে তুলছে। ভারত, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র—তিন পরাশক্তিই এই অঞ্চল নিয়ে উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, তারেক রহমানের গোপন বৈঠকে এই ভূরাজনৈতিক ভারসাম্যেরও আলোচনা হয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক অবস্থান এবং তারেক রহমানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, উভয়েই এই করিডোর পরিকল্পনায় একটি চুক্তিভিত্তিক অংশগ্রহণে আগ্রহী। তবে জনসমক্ষে এক অবস্থান আর পর্দার অন্তরালে ভিন্ন বার্তা—এই দ্বিমুখীতাই বিএনপিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
প্রশ্ন উঠছে—এই করিডোর পরিকল্পনায় বাংলাদেশের জাতীয় নিরাপত্তা কতটা ঝুঁকিতে পড়ছে? সেনা ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, করিডোর বাস্তবায়নের অর্থ হলো—অভ্যন্তরীণ সীমান্তে বহিরাগত সশস্ত্র তৎপরতা অনুমোদন, যার ভবিষ্যত প্রবাহ ভয়াবহ হতে পারে।
তবে একে একপাক্ষিকভাবে প্রত্যাখ্যানও বাস্তবসম্মত নয়, কারণ আন্তর্জাতিক মানবিক সংগঠন ও জাতিসংঘ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের উপর চাপ প্রয়োগ করছে। এই অবস্থায় রাজনৈতিক দ্ব্যর্থতা ও দ্বিচারিতা জাতীয় অবস্থানকে দুর্বল করে দিতে পারে।
যখন দেশের ভেতর করিডোর বিরোধী স্লোগান, তখন লন্ডনে বিএনপির নেতৃত্ব ‘সমাধানের পথে’ বৈঠক করছে—এটি বিএনপির ভেতরে মতবিরোধ, দ্বিমুখী কূটনীতি এবং নেতৃত্ব সংকটের প্রমাণ দিচ্ছে। জাতির সামনে আজ বড় প্রশ্ন: এই করিডোর সত্যিই কি রোহিঙ্গা সংকট সমাধানের পথ, নাকি একটি রাজনৈতিক অশ্বমেধ যজ্ঞ?
