বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হাসান নাসিরকে পুনরায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে সেনা সদর দপ্তর। তথ্য পাচার ও বিদ্রোহে উসকানির অভিযোগে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা বাহিনী। সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে আলোচিত ইস্যু হচ্ছে সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ হাসান নাসিরকে পুনরায় ‘Persona Non Grata (PNG)’ অর্থাৎ সেনানিবাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করার বিতর্ক। প্রবাসী ইউটিউবার কনক সারোয়ারের মাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে হাসান নাসির নিজেই দাবি করেন, তাকে সেনা সদর দপ্তর এই ঘোষণা দিয়েছে। প্রমাণস্বরূপ তিনি একটি নথিও উপস্থাপন করেন, যেখানে সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে অনুমতির প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ ছিল।
তবে প্রশ্ন উঠেছে, কেন এতদিন পর আবার তাকে পিএনজি ঘোষণা করা হলো? এ বিষয়ে সামরিক সূত্র বলছে, ৫ আগস্টের পর থেকে তিনি সেনাবাহিনীতে ‘সংস্কারের’ নামে একধরনের বিদ্রোহ উসকে দিচ্ছেন। তিনি সেনা থেকে বরখাস্ত হওয়া কিছু কর্মকর্তা ও সৈনিকের সঙ্গে প্রকাশ্যে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখছেন এবং তাদের উসকে দিয়ে বাহিনীর অভ্যন্তরে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছেন।
হাসান নাসির একসময় বিডিআর হত্যাকাণ্ড তদন্তে গঠিত জাতীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রকাশের আগেই তাকে সেই কমিটি থেকে বাদ দেওয়া হয়। সামরিক গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, বিডিআর হত্যাকাণ্ডে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ জড়িত—এমন গুজবের মূল উৎস হিসেবে তাকেই চিহ্নিত করা হয়েছিল।
এরপর থেকেই তাকে ‘রাষ্ট্রবিরোধী’ কার্যকলাপে যুক্ত হিসেবে মনে করা হয়। কিছু সূত্র মতে, সেনাবাহিনীর লজিস্টিক বিভাগে কর্মরত থাকা অবস্থায় দুর্নীতি ও নারী কেলেঙ্কারির মতো গুরুতর অভিযোগে তিনি আগে থেকেই শাস্তি পেয়েছিলেন। অথচ এসব বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কখনোই কোনো লিখিত বিবৃতি আসেনি।
তথ্যপ্রযুক্তির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে সেনাবাহিনীর গোপনীয়তা রক্ষা করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। সামরিক বাহিনীর ভেতরের তথ্য, অভিযোগ, কিংবা বহিষ্কৃত সদস্যদের অসন্তোষ এখন ইউটিউব, ফেসবুক কিংবা টেলিগ্রামের মাধ্যমে অতি সহজেই জনসমক্ষে আসছে। এটি শুধু বাহিনীর অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলাই নয়, বরং দেশের সার্বভৌমত্বের উপরও চাপ সৃষ্টি করছে।
বিদেশে থাকা দেশবিরোধী ইউটিউবারদের মাধ্যমে সেনাবাহিনীর স্পর্শকাতর ও গোপন তথ্য ফাঁস হচ্ছে—এমন অভিযোগ নতুন নয়। এই প্রেক্ষাপটে ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসিরের মতো কেউ যদি সরাসরি সেই প্রচারে অংশ নেন বা উৎসাহ দেন, তাহলে তা কেবল মাত্র রাজনৈতিক চক্রান্ত নয়—এটি একটি জাতীয় নিরাপত্তা সংকট।
সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা আইন অনুযায়ী, এমন কোনো কর্মকর্তা বা অবসরপ্রাপ্ত সদস্য যদি বাহিনীর গোপন তথ্য পাচার করেন কিংবা বিদ্রোহে ইন্ধন জোগান, তবে কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে বিচার করা সম্ভব। এমনকি বেসামরিক হলেও যদি তিনি রাষ্ট্রবিরোধী বা বাহিনীবিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকেন, তবুও তাকে আইনের আওতায় আনা যেতে পারে।
তবে এখন পর্যন্ত সেনা সদর থেকে হাসান নাসিরের বিরুদ্ধে কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা বা কোর্ট মার্শাল প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
একজন সেনা কর্মকর্তা যখন অবসর গ্রহণ করেন, তখনও তিনি বাহিনীর একটি জীবন্ত প্রতিনিধি হিসেবে গণ্য হন। তাদের আচরণ ও বক্তব্য বাহিনীর ভাবমূর্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। ব্রিগেডিয়ার (অব.) হাসান নাসিরের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ উঠেছে, সেগুলো যদি সত্য হয়, তবে তা কেবল সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা নয়—জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও এক ভয়াবহ বার্তা।
তথ্যপ্রবাহের এই উন্মুক্ত যুগে রাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা বাহিনীকে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বজায় রাখতে আরও প্রযুক্তিনির্ভর এবং গোয়েন্দাসজাগ হতে হবে। দেশের বিরুদ্ধে বা বাহিনীর বিরুদ্ধে কোনো প্ররোচনা বা তথ্য ফাঁসের ঘটনা যে শুধু বিতর্ক নয়, বরং একটি সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি—তা নতুন করে বোঝা দরকার।
