বাংলাদেশে মব সন্ত্রাস ২০২৫ সালে ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। গুম, পিটুনি ও লুটপাটের ঘটনা বাড়ছে। রাজনৈতিক মদদ ও প্রশাসনের ব্যর্থতা বিষয়টিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
২০২৫ সালের আগস্টকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে যে রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়েছে, তার একটি ভয়াবহ বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে ‘মব সন্ত্রাস’ বা জনতার নামে সহিংস হামলার ধারাবাহিকতা। একদিকে ধর্মীয় অনুভূতির নামে উস্কানি, অন্যদিকে বিরোধীদের দমনে ‘জনতার ক্ষোভ’ ব্যবহারের কৌশল—এই দুইয়ের মিশ্রণে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে এক আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি, যার বলি হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক উত্তেজনার পর থেকে দেশে মব সন্ত্রাসের ধারাবাহিকতা ক্রমাগত বেড়ে চলেছে।
২০২৫ সালের মাঝামাঝি এসে এর ভয়াবহতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে—এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধমূলক ঘটনা নয়, বরং একটি কাঠামোগত সহিংসতার রূপ নিয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা এমএসএফ-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত দেশে ২৫৩টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে, যাতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৬৩ জন এবং আহত হয়েছেন ৩১২ জন। শুধু জুন মাসেই ঘটেছে ৪১টি মব হামলা।
প্রশ্ন উঠছে—এই সহিংসতার পেছনে কারা? আর কেনই বা প্রশাসন নীরব?
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, এইসব মব সন্ত্রাসের পিছনে রয়েছে এমন সব গোষ্ঠী, যারা কখনো সরকারকে সমর্থন করছে, আবার কখনো ক্ষমতা বদলের খেলায় সরাসরি জড়িত।
তাদের মধ্যে প্রথম সারিতে আছে এনসিপি, জামায়াত-শিবিরের ভিন্ন রূপে সংগঠিত ছায়া সংগঠন, বিএনপি ও ছাত্রদলের মাঠপর্যায়ের কর্মীরা, ধর্মীয় সংগঠনের উগ্রপন্থী অংশ এবং তথাকথিত বৈছা আন্দোলন।
অত্যন্ত উদ্বেগজনকভাবে দেখা গেছে, এই গোষ্ঠীগুলোর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বহু কিশোর গ্যাং। স্থানীয়ভাবে “চাঁদাবাজ”, “ধর্মরক্ষক” কিংবা “জনতার নেতা” রূপে পরিচিত হলেও বাস্তবে তারা সহিংস সন্ত্রাসে লিপ্ত এক একটি সংগঠিত বাহিনী।
গাজীপুর, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, নোয়াখালী থেকে শুরু করে কুমিল্লার মুরাদনগর—সারা দেশজুড়ে অজস্র ঘটনার পুনরাবৃত্তি হচ্ছে।
বাড়িঘর ভাঙচুর, দোকান লুট, মানুষ পিটিয়ে হত্যা—এসব যেন এখন “নতুন স্বাভাবিক” হয়ে দাঁড়িয়েছে।
কুমিল্লার মুরাদনগরে একসঙ্গে মা, ছেলে ও মেয়েকে পিটিয়ে হত্যা, গাজীপুরে ১৯ বছরের পোশাক শ্রমিক হৃদয়কে রশি দিয়ে বেঁধে পিটিয়ে হত্যা, কিংবা নোয়াখালীতে আওয়ামী লীগ নেতার মাকে কুপিয়ে স্বর্ণালংকার লুট—এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো একটি সমাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের লক্ষণ।
আইজিপি বাহারুল আলম নিজেই স্বীকার করেছেন, “মব সন্ত্রাস দমনে পুলিশের একার পক্ষে সম্ভব নয়, সামাজিক সহযোগিতা প্রয়োজন।”
তবে প্রশ্ন উঠছে—যেখানে রাষ্ট্র নিজেই সহিংস গোষ্ঠীকে আশ্রয় দেয়, সেখানেই বা সামাজিক প্রতিরোধ আসবে কোথা থেকে?
কুমিল্লা পুলিশ সুপার ঘটনাস্থলে গিয়েছেন, তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন, কিন্তু হত্যার পরদিন পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করেননি।
গাজীপুরেও একই চিত্র—সাধারণ মানুষ হামলার শিকার হলেও, গ্রেপ্তার হচ্ছে উল্টো তারাই।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য বলছে—অধিকাংশ মব সন্ত্রাসের ঘটনার পর অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয় না, আর মামলা হলেও বিচারে পৌঁছায় না। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতিই সহিংসতাকে উৎসাহ দিচ্ছে।
ড. তৌহিদুল হক যেমনটি বলেছেন, “আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী শুধু নিষ্ক্রিয় নয়, বরং কখনো কখনো নীরব সমর্থক হয়ে উঠেছে।” বিষয়টি এমন যে, আইনের অভাবেই মানুষ এখন আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে।
বাংলাদেশে মব সন্ত্রাস এখন শুধু একটি অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রীয় নীরবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেখানে আইনের বদলে উত্তেজিত জনতা শাসন করছে, সেখানে রাষ্ট্র তার সংবিধানগত দায়িত্ব পালন করছে না।
এ অবস্থা চলতে থাকলে সামাজিক অস্থিরতা আরও বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এটি হবে এক ভয়াবহ দৃষ্টান্ত।
