মালয়েশিয়ায় ধরা পড়া ‘জিআরএমবি’ নামের বাংলাদেশি জঙ্গি গোষ্ঠী সিরিয়া ও বাংলাদেশের আইএস সেলকে অর্থায়ন করছিল। কীভাবে সংগঠিত হচ্ছিল এই অপারেশন?
মালয়েশিয়ার পুলিশ সম্প্রতি যেভাবে একটি বাংলাদেশি জঙ্গি গোষ্ঠী ‘গেরাকান মিলিটান র্যাডিক্যাল বাংলাদেশ’ (জিআরএমবি)-কে আটক করেছে, তা দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা কাঠামোর জন্য একটি অশনিসংকেত হয়ে দাঁড়িয়েছে। জঙ্গিবাদ যে শুধু যুদ্ধবিধ্বস্ত মধ্যপ্রাচ্য বা আফ্রিকাতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অভিবাসী-নির্ভর সমাজেও এটি মজ্জাগতভাবে ঢুকে পড়েছে, তার একটি বাস্তব উদাহরণই এ ঘটনা।
মালয়েশিয়ার আইজিপি দাতুক সেরি মোহাম্মদ খালিদ ইসমাইল জানিয়েছেন, ‘জিআরএমবি’ মূলত হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামভিত্তিক একটি গোপন চক্র হিসেবে কাজ করত।
প্রতিটি সদস্য বার্ষিক ৫০০ মালয়েশিয়ান রিংগিত ফি দিত এবং দাতব্য অনুদান সংগ্রহ করেও অর্থ জোগাড় করা হতো।
সংগঠনটি সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্য অর্থায়ন করলেও সরাসরি মালয়েশিয়ায় হামলার পরিকল্পনা তাদের ছিল না—তবে এটি যেন আত্মতুষ্টির কারণ না হয়, সে বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা একমত।
জঙ্গিগোষ্ঠীটি মালয়েশিয়ার নির্মাণ খাত ও শিল্পে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমজীবীদের মধ্য থেকে সদস্য সংগ্রহ করত।
সদস্যপদ পেতে হলে প্রথমে আদর্শগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতো এবং শপথ নিতে হতো। এটি স্পষ্টতই প্রমাণ করে যে, প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে কিছু অংশ পরিকল্পিতভাবে আইএস মতাদর্শে উদ্বুদ্ধ হচ্ছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থার প্রভাব রয়েছে।
মালয়েশিয়া পুলিশ জানিয়েছে, তারা এখনো নিশ্চিত নয় এই সংগঠনের আন্তর্জাতিক শাখাগুলোর সঙ্গে কী ধরনের যোগাযোগ ছিল।
তবে সিরিয়া ও বাংলাদেশের আইএস সেলে অর্থ পাঠানোর তথ্য এটিই প্রমাণ করে যে, এটি একটি বহুজাতিক অর্থ-সন্ত্রাসী চক্র।
ইন্টারপোল ও অন্যান্য দেশের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর সহায়তায় তদন্ত চলছে, যার মাধ্যমে এই সেলটির আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কও প্রকাশ পেতে পারে।
পুলিশ ২৮ এপ্রিল থেকে ২১ জুন পর্যন্ত তিন ধাপে অভিযান চালিয়ে ৩৬ জন বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করে, যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। এদের মধ্যে ৫ জনের বিরুদ্ধে সরাসরি সন্ত্রাসবাদ আইনে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে। ১৫ জনকে ইমিগ্রেশন বিভাগে হস্তান্তর করা হয় এবং বাকি ১৬ জনের বিষয়ে তদন্ত চলমান।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই সেলের শীর্ষ নেতাও গ্রেপ্তার হয়েছে, যা এই অপারেশনকে আরও ফলপ্রসূ করে তোলে।
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। যদিও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আওতায় মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষ তথ্য আদান-প্রদান করছে।
তবে প্রশ্ন রয়ে যায়—বাংলাদেশে আইএস সক্রিয় থাকার যেসব অভিযোগ আছে, সেগুলোর পেছনে ‘জিআরএমবি’র মতো প্রবাসভিত্তিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা কতটা?
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি অভিবাসীদের মধ্যে সক্রিয় জঙ্গি তৎপরতা শুধু সে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার সন্ত্রাসবাদ চক্রের এক গভীর ও বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছে।
বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম যদি অর্থনৈতিক অসচ্ছলতা ও পরিচয় সংকটের ফাঁদে পড়ে প্রবাসেও র্যাডিকালাইজেশনের শিকার হয়, তাহলে কেবল কঠোর নিরাপত্তা নয়—জনসচেতনতা ও আইডিওলজিক্যাল প্রতিরোধ গড়ে তোলাও জরুরি হয়ে দাঁড়ায়।
