২০২৫ সালে দিনে গড়ে ১১টি খুনের ঘটনা বাংলাদেশে আইন-শৃঙ্খলার গুরুতর অবনতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিশ্লেষণমূলক এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে সাম্প্রতিক খুন, অপরাধ প্রবণতা, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিক্রিয়া।
২০২৫ সালের প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার আগেই বাংলাদেশে খুনের পরিসংখ্যান ভয়ঙ্কর বার্তা দিচ্ছে। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১,৯৩০টি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১১টি খুন— যা এক কথায় দেশের আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির বিপর্যয়ের প্রতিচ্ছবি।
পুরান ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতালের সামনে দিনের আলোয় সোহাগ হত্যাকাণ্ড, খুলনার যুবদল নেতা মাহবুবুর রহমানের প্রকাশ্য গুলি করে হত্যাসহ সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো শুধু ‘ক্রাইম রিপোর্ট’ নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর প্রতি সরাসরি চ্যালেঞ্জ।
পরিসংখ্যান যা আতঙ্ক জাগায়
২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে খুনের সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে:
| মাস | খুনের সংখ্যা |
|---|---|
| জানুয়ারি | ২৯৪ জন |
| ফেব্রুয়ারি | ৩০০ জন |
| মার্চ | ৩১৬ জন |
| এপ্রিল | ৩৩৬ জন |
| মে | ৩৪১ জন |
| জুন | ৩৪৩ জন |
এ তালিকা বলছে, খুনের হার নিয়ন্ত্রণে নয়, বরং ঊর্ধ্বমুখী।
বিশ্লেষক ও মানবাধিকারকর্মীদের মতে, খুনের বড় একটি অংশের পেছনে রয়েছে রাজনৈতিক আধিপত্য, চাঁদাবাজি ও দুর্বৃত্তায়ন। মিটফোর্ডের সোহাগ হত্যাকাণ্ড কিংবা খুলনায় যুবদল নেতার খুন—এই দুই ঘটনাই স্থানীয় রাজনৈতিক গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব ও নিয়ন্ত্রণ কায়েমের রক্তাক্ত পরিণতি।
এএসএম নাসির উদ্দিন এলান সঠিকভাবেই মন্তব্য করেছেন, “জুলাই আন্দোলনের যে নৈতিক অর্জন ছিল, তা আজ রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে ভরাডুবি ঘটেছে।”
পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম দেশব্যাপী ‘আধিপত্য বিস্তারকারীদের তালিকা’ তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, মিটফোর্ড হত্যাকাণ্ডে জড়িত পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
তবে প্রশ্ন হলো, এই প্রতিক্রিয়াগুলো যথাসময়ে, নাকি ঘটনার পর জনগণের চাপেই?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তাৎক্ষণিক অ্যাকশন দাবি করা হলেও অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধমূলক নয়, প্রতিক্রিয়ামূলক পদক্ষেপ চোখে পড়ছে।
তিনি স্পষ্টভাবে বলেন:
“চারটি কেয়ারটেকার সরকারের সময় আইনশৃঙ্খলা ভালো ছিল। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার এক বছর অতিক্রম করলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রাজনৈতিক সরকারের বিকল্প নেই।”
এ মন্তব্যে স্পষ্ট যে রাজনৈতিক অস্পষ্টতা আইন-শৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে, যার ফলে অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসন গঠন
দলীয় পরিচয়মুক্ত তদন্ত ও শাস্তির নিশ্চয়তা
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দক্ষতা বৃদ্ধি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
সামাজিক সচেতনতা ও পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা
সোহাগ হত্যাকাণ্ডের ভিডিও দেখে সাধারণ মানুষ প্রশ্ন তুলেছে—“মানুষ এতটা নিষ্ঠুর হয় কীভাবে?”
এই প্রশ্নের উত্তর রাষ্ট্র, সরকার ও সমাজের কাছে একসঙ্গে জমা পড়ে রয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখন আর শুধুই পুলিশের দায়িত্ব নয়, পুরো জাতির অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
