কক্সবাজারের টেকনাফে পায়ুপথে ২ হাজার ইয়াবা পাচারকালে বিএনপি নেতা নূর মোহাম্মদ আটক। ঘটনাটি রাজনৈতিক ব্যক্তিদের মাদক চক্রে জড়িত থাকার প্রমাণ কি?
টেকনাফ সীমান্ত এলাকা একসময় ছিল প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, পর্যটন ও সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের জন্য বিখ্যাত। কিন্তু গত এক দশকে মাদক পাচারের হটস্পটে পরিণত হওয়ায় এই অঞ্চলের পরিচয় যেন পাল্টে গেছে। সর্বশেষ, ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নূর মোহাম্মদের পায়ুপথ থেকে ২ হাজার ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার, কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং এটি স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃত্বের অংশগ্রহণে সক্রিয় মাদক চক্রের ভয়াবহ চিত্রকে প্রকাশ করে।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) ৬৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ১২ জুলাই সকালে মেরিন ড্রাইভের উখিয়ার ইমামের ডেইল এলাকায় চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হয়।
একটি প্রাইভেটকার থামিয়ে তল্লাশি চালালে আরোহী নূর মোহাম্মদ সন্দেহজনক আচরণ করেন।
জিজ্ঞাসাবাদে তিনি নিজেই স্বীকার করেন, তার পায়ুপথে ইয়াবা লুকানো আছে।
এরপর বায়ুবিরোধী দুইটি কালো প্যাকেট থেকে ২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।
নূর মোহাম্মদ শুধুমাত্র একজন সাধারণ মাদক পাচারকারী নন—তিনি একটি রাজনৈতিক দলের সক্রিয় নেতা।
বিএনপির স্থানীয় ওয়ার্ড পর্যায়ের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার পরিচয় রাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ।
যদিও তার দলীয় সভাপতি আব্দুল গফুর দাবি করেছেন, “মৌখিকভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন এবং আটক হওয়ার পরপরই বহিষ্কার করা হয়েছে”, তবুও প্রশ্ন রয়ে যায়:
একজন রাজনৈতিক নেতার পায়ুপথে মাদক বহনের ঘটনা কীভাবে রাজনৈতিক দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
এই ঘটনা ফের আলোচনায় এনেছে একটি পুরোনো কিন্তু প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন—কীভাবে স্থানীয় রাজনীতির ছত্রছায়ায় মাদক কারবারীরা নিরাপদ আশ্রয় পায়?
টেকনাফ ও কক্সবাজার এলাকায় বহু বছর ধরেই অভিযোগ রয়েছে যে কিছু জনপ্রতিনিধি ও রাজনৈতিক নেতার মদদেই ইয়াবা সিন্ডিকেট পরিচালিত হয়।
২০১৯ সালে র্যাব ও পুলিশ কয়েকজন জনপ্রতিনিধিকে তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। তবুও মাদক প্রবাহ থেমে নেই।
মাদক পাচারে এখন ‘Body Packing’ বা পায়ুপথ ব্যবহার করে বহনের প্রবণতা বাড়ছে।
এটি একদিকে পাচারকারীর দেহকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার, অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জও বটে।
এই পদ্ধতিতে চিহ্নিত না হলে একাধিক নিরাপত্তা চেকপোস্ট অতিক্রম করা সম্ভব। প্রশ্ন হলো,
এই কৌশল ব্যবহারের পেছনে কি রাজনৈতিক পরিচয় এক ধরনের নিরাপত্তার ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছিল?
বিএনপির স্থানীয় নেতৃত্ব বলেছে, নূর মোহাম্মদকে বহিষ্কার করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো,
- দলীয় যাচাই-বাছাই কতটা কঠোর?
- রাজনৈতিক পরিচয় দিয়ে মাদক ব্যবসায়ীরা কীভাবে নেতা হয়ে ওঠে?
- দলের দায় কি শুধুই বহিষ্কারে শেষ, নাকি আরও গভীর অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি অভিযান দরকার?
এই ঘটনা শুধু রাজনৈতিক নৈতিকতা নয়, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনের শাসন এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার প্রশ্ন। মাদক নির্মূলের দায়িত্ব শুধু বিজিবি বা পুলিশের নয়, বরং রাজনৈতিক দলগুলোরও সৎ অবস্থান গ্রহণ জরুরি। দলীয় পরিচয় কোনো অপরাধীর রক্ষাকবচ হতে পারে না—এমন বার্তা স্পষ্টভাবে দিতে হবে।
নূর মোহাম্মদের পায়ুপথে ইয়াবা বহন শুধু একটি ব্যক্তি অপরাধ নয়, এটি রাজনৈতিক কাঠামোর ফাঁকফোকর, সমাজের নৈতিক অবক্ষয় এবং রাষ্ট্রের আইন প্রয়োগের দুর্বলতার এক নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি।
এই ঘটনার পূর্ণ তদন্ত এবং অপরাধী যেই হোক, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি এখন জনসাধারণের।
