২০২৫ সালের রাজনৈতিক সংকটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কী ভুল শত্রুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে? ভিয়েতনাম ও ১৯৭১ সালের উদাহরণে দেখা যাচ্ছে, ভুল শত্রু নির্ধারণের পরিণতি ভয়াবহ।
“তোমার শত্রু কে?”—এটাই যেকোনো লড়াইয়ের পূর্বশর্ত। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, সেনাবাহিনী কি এই মৌলিক সত্যকে ভুলে গেছে? নাকি তারা একটি স্ট্রম্যান শত্রুকে তৈরি করে সেই ভুলের পথে হাঁটছে, যে ভুল ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী করেছিল, আর ভিয়েতনামে করেছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র?
সামরিক বাহিনী তাদের ট্রেনিংয়ে যে মানসিক প্রস্তুতি পায়, তা মূলত ব্যক্তিগত চেতনা বিলুপ্ত করে, আদেশ মান্যতাই হয়ে ওঠে একমাত্র কর্তব্য।
এই ডিসোশালাইজেশন সেনাদের সূক্ষ্ম রাজনৈতিক বিশ্লেষণ থেকে বঞ্চিত রাখে।
ফলে তারা প্রায়শই প্রকৃত শত্রু চিনতে ব্যর্থ হয়।
শত্রু নির্ধারণে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া তাদের অবস্থান হয় অন্ধ, বিভ্রান্তিকর।
১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ভেবেছিল, তাদের প্রতিপক্ষ ভারতীয় দালাল বা হিন্দুদের প্রভাবিত শক্তি।
কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা যুদ্ধ করছিল একটি অদম্য বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিরুদ্ধে।
সেই ভুল প্রোপাগান্ডার ফাঁদেই তারা নিজেরাই নিজেদের ধ্বংস ডেকে এনেছিল।
ঠিক এমনটিই হয়েছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধেও।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল তারা কমিউনিজম রুখতে যাচ্ছে।
কিন্তু বাস্তবে তারা লড়ছিল ভিয়েতনামী জাতীয়তাবাদ ও স্বাধীনতাকামী চেতনার বিরুদ্ধে।
নোয়াম চমস্কি তার বই Rethinking Camelot (1993) এ স্পষ্টভাবে বলেছেন, আমেরিকার পরাজয়ের মূল কারণ ছিল ভুল শত্রু চিনে যুদ্ধে নামা।
বর্তমানে সেনাবাহিনী কী করতে চাইছে? মার্কিন ডিপ স্টেট ও পাকিস্তান ঘরানার “ইসলামিক ন্যারেটিভ” ধারন করে তারা কি একটি নতুন প্রকারের “ইসলামী রাষ্ট্র” গঠনের কল্পনায় বিভোর? তারা কি ভুলে যাচ্ছে, এই ভূখণ্ডে ধর্মীয় পরিচয় নয়, বাঙালি জাতিসত্তাই সর্বোচ্চ রাজনৈতিক শক্তি?
ধর্ম দিয়ে কখনোই বাঙালি জাতীয়তাবাদকে প্রতিস্থাপিত করা যায় না।
যারা এই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে, তারা হয় হতাশ, ট্রমাটাইজড বা ভ্রান্তপ্রবণ কিছু ব্যক্তির প্রপাগান্ডায় আচ্ছন্ন।
তাদের মনে রাখা উচিত, ২০২৪ সালের রঙিন বিপ্লবের ব্যর্থতা এবং ২০২৫ সালের গোপালগঞ্জের বার্তা তাদের জন্য সরাসরি সতর্কবাণী।
গোপালগঞ্জে ২০২৫ সালের ঘটনায় সেনাবাহিনী বেছে নিয়েছে দমনমূলক কৌশল—যেখানে রাজনৈতিক প্রতিবাদকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ, গোপন গ্রেপ্তার, এবং কবরের উপর নিষ্ঠুর হস্তক্ষেপ দেখা গেছে।
এই আচরণ কি জাতীয়তাবাদী জনতার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সামিল নয়?
যদি সেনাবাহিনী মনে করে, কিছু প্রান্তিক ইসলামপন্থী বা মার্কিন প্রোপাগান্ডা দ্বারা চালিত স্ট্র্যাটেজির মাধ্যমে তারা জাতীয়তাবাদকে দমন করতে পারবে, তাহলে তাদের ভবিষ্যত ঠিক ১৯৭১ সালের টিক্কা খান ও ইয়াহিয়া খানের মতোই হবে—চরম অপমানজনক ও ধ্বংসাত্মক।
সর্বকালের সর্বস্থানেই দেখা গেছে, সেনাবাহিনী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ব্যতীত শুধু শারীরিক শক্তি ব্যবহার করে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলে তারা সর্বদা ভুল শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে।
তাদের কার্যক্রম হয় স্বল্পমেয়াদে সফল মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে চরম ব্যর্থতার নামান্তর।
বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দমন করা নয়, বরং বোঝা, গ্রহণ করা এবং সম্মান করা—এটাই বর্তমান সংকটের একমাত্র সমাধান।
আপনার প্রতিপক্ষ কি সাইবার স্পেসে ‘নাস্তিক’ বলে গালি দেওয়া কিছু প্রোফাইল? না কি আপনাকে ঘিরে ধৈর্য হারানো বাঙালি জনগণ, যারা গণতন্ত্র ও অধিকার চায়?
শত্রু চিনুন—নইলে সেই ভুল শত্রুর হাতে পতন হবে অনিবার্য।
