১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুর হত্যার পর সামরিক শাসক জিয়ার আমলে ৭১,৫০০ বানর রপ্তানির ভয়াবহ চুক্তি করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল পারমাণবিক রেডিয়েশন পরীক্ষা। প্রতিবাদ ও এক সাহসী আইনি লড়াইয়ে রক্ষা পায় লাখো প্রাণ। এই গভীরতর অনুসন্ধানে ফিরে দেখা সেই সময়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। সেদিন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে কেবল এক রাজনৈতিক বিপর্যয়ই শুরু হয়নি, এর ছায়া নেমে আসে প্রাণিজগতের ওপরেও। বঙ্গবন্ধুর প্রবর্তিত পরিবেশ ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা নীতির মৃত্যু ঘটে একই সঙ্গে। ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু ও ইন্দিরা গান্ধী যৌথভাবে ভারত-বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী রপ্তানির পথ বন্ধ করে দেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যার মাত্র কয়েক মাস পরই সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান সেই নীতি ভেঙে মার্কিন সামরিক ল্যাবরেটরির কাছে ৭১,৫০০ বানর রপ্তানির চুক্তি করেন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল পারমাণবিক রেডিয়েশন পরীক্ষায় প্রাণীদের ব্যবহার।
১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে, ডেট্রয়েটের ‘মোল এন্টারপ্রাইজ’-এর মাধ্যমে মার্কিন সামরিক গবেষণা সংস্থাগুলোর সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পাদন করে জিয়ার সরকার।
চুক্তির আওতায় ৭১,৫০০ বানর ও উল্লুক রপ্তানির প্রস্তুতি শুরু হয়।
সেই সময় জানা যায়, এই প্রাণীগুলিকে ব্যবহার করা হবে পারমাণবিক বিস্ফোরণের প্রভাব পরীক্ষায়।
মার্কিন সেনাবাহিনীর গবেষণাগারে এই প্রাণীদের শরীরে প্রয়োগ করা হবে রেডিয়েশন, যা ধীরে ধীরে মৃত্যু ডেকে আনবে।
১৯৭৯ সালের জানুয়ারিতে এই প্রকল্পের প্রথম দফায় ১,৬০০ বানর রপ্তানি সম্পন্ন হয়। কাভার্ড ভ্যানে রাতের আঁধারে সামরিক প্রহরায় এদের বনে থেকে তুলে আনা হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. জাকির হোসেন এবং আমেরিকার International Primate Protection League (IPPL)-এর শার্লি ম্যাকগিল এই চুক্তির বিরুদ্ধে সক্রিয় প্রতিবাদ শুরু করেন।
১৯৭৯ সালের জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মালেক উকিল একটি বিস্তারিত বক্তৃতা দেন।
তিনি প্রশ্ন তোলেন,যদি আজ বানর যায়, কাল কি গরিব শিশুরাও যাবে এই ল্যাবে রেডিয়েশনের জন্য? এই বক্তব্যে মিডিয়ায় তোলপাড় সৃষ্টি হয়।
‘সংবাদ’, ‘ইত্তেফাক’সহ বহু পত্রিকা বানর রপ্তানির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন ছাপে। জনমতের চাপে জিয়ার সরকার রপ্তানি স্থগিত করতে বাধ্য হয়।
মার্কিন হুমকি: “বানর রপ্তানি করো, না হলে সাহায্য বন্ধ”
ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন দূতাবাস কূটনৈতিক প্রথা লঙ্ঘন করে সরাসরি চাপ দিতে থাকে।
এমনকি ওয়াশিংটনের বাংলাদেশ দূতাবাসকে ডেকে হুমকি দেওয়া হয় – “Export the monkeys or forget U.S. aid.”
এমনই রিপোর্ট প্রকাশ করে তৎকালীন New Scientist পত্রিকা।
এরশাদ ক্ষমতায় আসার পর মার্কিন এক প্রাণীপ্রেমী তরুণীর ফোন কলেই তিনি চুক্তি বাতিল করে দেন।
তখন ক্ষতিপূরণ চেয়ে মোল এন্টারপ্রাইজ ডেট্রয়েট আদালতে বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেয়।
সরকার লড়াইয়ে নামতে চায়নি। তখন এগিয়ে আসে IPPL। কিন্তু তাদের কাছে বড়সড় উকিল নিয়োগের অর্থ ছিল না।
এই অবস্থায় এক নামী মার্কিন মানবাধিকার আইনজীবী বিনা পারিশ্রমিকে মামলাটি লড়তে সম্মত হন।
মামলা গড়ায় কয়েক বছর। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ জিতে যায় এবং বেঁচে যায় লক্ষাধিক নিরীহ প্রাণ। তারা ফিরে পায় তাদের বন, তাদের পৃথিবী।
যে বঙ্গবন্ধু বাঙালিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন স্বাধীনতার, সেই স্বপ্নে ছিল পরিবেশ ও প্রকৃতি রক্ষার প্রতিশ্রুতি।
৭৫-পরবর্তী বাংলাদেশ শুধু রাজনৈতিকভাবে নয়, নৈতিক দিক থেকেও এক অন্ধকার সময় পার করেছে।
এই বানর রপ্তানির পেছনে যে ভয়ংকর সামরিক-রাজনৈতিক-আন্তর্জাতিক জোট কাজ করেছিল, তার বিরুদ্ধে কিছু মানুষের লড়াই ও গণচাপের জোরে তা রোখা সম্ভব হয়েছিল।
