রূপগঞ্জের একটি মসজিদে প্রথম কাতারে নামাজ পড়তে না পেরে পিস্তল হাতে হামলা চালান অবসরপ্রাপ্ত মেজর হারুন। ঘটনায় আহত মাদ্রাসা শিক্ষার্থী, প্রশ্ন উঠেছে অস্ত্রের লাইসেন্স ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার বাড়িয়াছনি গ্রামে এক অবসরপ্রাপ্ত মেজরের পিস্তল উঁচিয়ে মসজিদে হামলার ঘটনা যেন একটি বড় সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক সদস্য যখন ঈমান, শৃঙ্খলা ও সহনশীলতার পবিত্র স্থান মসজিদে অস্ত্র হাতে প্রবেশ করেন, তখন তা শুধু বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়—বরং সমাজের গভীরে থাকা ক্ষমতার অপব্যবহার, উগ্রতা এবং নৈতিক স্খলনের প্রতিচ্ছবি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ফজরের নামাজের সময় প্রথম কাতারে দাঁড়াতে না পারায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর হারুন অর-রশিদ উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
মাদ্রাসার ছাত্রদের সঙ্গে বাকবিতণ্ডার একপর্যায়ে তিনি নিজের লাইসেন্স করা পিস্তল বের করেন এবং ভয় দেখান।
এতে হাফেজ মিজান নামে একজন ছাত্র আহত হন।
একে শুধু ‘ধর্মীয় মতপার্থক্য’ বলে পাশ কাটানো যায় না।
প্রশ্ন হলো, একজন নাগরিক কীভাবে দিনের পর দিন অস্ত্র উঁচিয়ে জনসাধারণকে ভয় দেখাতে পারেন? কেন বারবার একই ব্যক্তি বিতর্কিত ঘটনায় জড়ানোর পরও প্রশাসন নীরব?
অভিযুক্ত মেজরের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি হাম্বলী মতে নামাজ পড়েন, আর স্থানীয় মুসল্লিরা হানাফি।
মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু তা কি পিস্তল বের করে ভয় দেখানোর বৈধতা দেয়? ইসলাম আমাদের সহনশীলতা ও যুক্তির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের নির্দেশনা দেয়।
অথচ এখানে অস্ত্র হয়ে উঠেছে বিতর্কের উত্তর।
স্থানীয়দের মতে, মেজর হারুন দীর্ঘদিন ধরেই এলাকায় আতঙ্কের রাজত্ব কায়েম করেছেন।
জমি সংক্রান্ত বিরোধে আগেও তিনি অস্ত্র উঁচিয়ে গুলি ছোড়ার হুমকি দিয়েছেন।
১৯ ফেব্রুয়ারি টেকনোয়াদ্দা এলাকায় তার হুমকির ভিডিও ভাইরাল হয়।
তখনো পুলিশ শুধু ‘খবর রাখা হচ্ছে’ বলেই দায়সারা মন্তব্য করেছিল।
এবারও রূপগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন, “লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি, স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা চলছে।”
প্রশ্ন জাগে—যদি কোনো সাধারণ মানুষ একই কাজ করতেন, পুলিশ কি একইরকম নীরব থাকত?
যে অস্ত্র বৈধভাবে লাইসেন্স করা, তা কি বারবার জনসমক্ষে ভয় দেখানোর কাজে ব্যবহারের পরও বৈধ থাকে?
এমন ঘটনার পর শুধু অস্ত্র জব্দ করাই যথেষ্ট নয়।
লাইসেন্স বাতিল, আইনি ব্যবস্থা ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্যায়ন জরুরি।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা যদি সামাজিক সহনশীলতা হারিয়ে অস্ত্রের মাধ্যমে শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে ব্যস্ত হন, তবে তা পুরো পেশাদার বাহিনীর ভাবমূর্তিতেই আঘাত হানে।
এই ঘটনায় রাষ্ট্র, সমাজ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান—সবারই দায় রয়েছে। স্থানীয় মানুষ প্রতিবাদ জানালেও প্রশাসন নিরব। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিবৃতি দিলেও পুলিশ বলছে “মীমাংসা চলছে”। এভাবে কি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়?
এটি সময়োপযোগী হয়ে উঠেছে—আইনের শাসনের প্রতি আস্থা ফেরানোর, বৈধ অস্ত্রের অপব্যবহারে ‘জিরো টলারেন্স’ দেখানোর, এবং যারা ধর্মীয় স্থানে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার।
অবসরপ্রাপ্ত মেজরের মসজিদে হামলা কেবল একটি গ্রাম বা ব্যক্তির ইস্যু নয়, এটি রাষ্ট্র ও সমাজের সহনশীলতার পরীক্ষায় ব্যর্থতার দলিল।
প্রশ্ন উঠেছে, অস্ত্র যার হাতে তার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে হবে? এবং ধর্ম যার কাছে পবিত্র, সে কেন মসজিদে আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করে?
