পুলিশের চার ডিআইজিকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়ার ঘটনায় পুলিশ বিভাগে অসন্তোষ ও রাজনৈতিক আনুগত্য নিয়ে গুঞ্জন বাড়ছে। এটি কি জনস্বার্থ না কি আজ্ঞাবহ পুনর্বিন্যাস?
২৮ জুলাই ২০২৫, সোমবার — রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা একাধিক প্রজ্ঞাপনে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশ পুলিশের চারজন উপ-মহাপরিদর্শককে (ডিআইজি)। প্রজ্ঞাপনে এ সিদ্ধান্তকে “জনস্বার্থে” বলা হলেও, প্রশাসনের অভ্যন্তরে ও পুলিশ মহলে শুরু হয়েছে চর্চা ও গুঞ্জনের ঢেউ।
বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তারা হলেন:
- আতিকা ইসলাম – সংযুক্ত ডিআইজি, ঢাকা রেঞ্জ
- মো. মাহবুব আলম – সংযুক্ত ডিআইজি, রেলওয়ে পুলিশ
- মো. মনির হোসেন – সংযুক্ত ডিআইজি, শিল্পাঞ্চল পুলিশ
- এ কে এম নাহিদুল ইসলাম – সংযুক্ত ডিআইজি, পুলিশ টেলিকম
তাদের মধ্যে কয়েকজন দীর্ঘদিন ধরে শৃঙ্খলা, তদন্ত এবং গোয়েন্দা কাজের ক্ষেত্রে দক্ষতার স্বাক্ষর রেখেছেন বলে জানা গেছে।
একজন শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“দলীয় আনুগত্য নিশ্চিত করতে এখনো কাজ করা দক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ কর্মকর্তাদের হঠানো হচ্ছে। এভাবে পুলিশ বিভাগে ভয় ও নির্ভরতা একসাথে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।”
তাঁর দাবি, তালিকা ধরে ধরে “বিশ্বস্ত নয়” এমন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিয়ে শূন্যপদ পূরণ করা হবে “সম্পূর্ণ আজ্ঞাবহ” অফিসারদের দিয়ে।
এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, পুলিশ বিভাগে পেশাদারিত্ব নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্যই এখন মূল বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের নিরপেক্ষতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অন্যতম স্তম্ভ।
সরকারি প্রজ্ঞাপনগুলোতে “জনস্বার্থে” শব্দটি ব্যবহৃত হলেও, এতে সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
‘জনস্বার্থ’ কীভাবে সংজ্ঞায়িত হলো বা এই কর্মকর্তারা কীভাবে জনস্বার্থে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন — এই প্রশ্নগুলোর উত্তর মিলছে না।
এর ফলে সাধারণ জনগণের মাঝেও তৈরি হচ্ছে বিভ্রান্তি।
পুলিশ বা প্রশাসনে বাধ্যতামূলক অবসরের ঘটনা অতীতে একাধিকবার দেখা গেছে।
তবে এবার একসাথে চারজন ডিআইজিকে অবসর দেওয়া এক ব্যতিক্রমী দৃষ্টান্ত, যা আবারও ১/১১ পরবর্তী প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের স্মৃতি উসকে দিচ্ছে।
তখনও একইভাবে কিছু কর্মকর্তাকে “জনস্বার্থে” সরিয়ে দিয়ে আজ্ঞাবহদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছিল, যার ফলস্বরূপ প্রশাসনে পেশাগত স্বাধীনতার বড় ধস নামে।
ডিআইজি পদটি শুধু একটি প্রশাসনিক পদ নয়, এটি একটি নীতিনির্ধারণী অবস্থান।
জেলা পর্যায়ে পুলিশ সুপারদের উপর তদারকি, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ডিআইজিরা।
তাদের জায়গায় যেসব কর্মকর্তা বসানো হবে, তাদের পেশাগত সক্ষমতা ও রাজনৈতিক সংযোগ ভবিষ্যতের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করতে পারে।
এ ঘটনাকে কেউ কেউ স্বাভাবিক প্রশাসনিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখলেও, ভেতরের অসন্তোষ এবং অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের মন্তব্যে বোঝা যায় — বিষয়টি অনেক গভীর।
পুলিশের মতো একটি সংবেদনশীল ও ক্ষমতাবান প্রতিষ্ঠানে যদি আনুগত্যই প্রধান বিবেচ্য হয়, তবে তার ফলাফল হতে পারে বিপর্যয়কর।
জনগণের আস্থা অর্জনের জন্য প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, দক্ষ ও নিরপেক্ষ পুলিশ বাহিনী।
আর সেটা নিশ্চিত করতে হলে “জনস্বার্থে” নয়, “জাতীয় স্বার্থে” বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে — যেখানে প্রথম বিবেচ্য হবে পেশাদারিত্ব, আইনানুগতা ও সেবার মান।
