যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফেরত পাঠানো ৩৯ বাংলাদেশিকে হাতকড়া ও শেকল পরানো হয়, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তোলে। অভিবাসন, দারিদ্র্য ও বিশ্ব রাজনীতির জটিল বাস্তবতায় এই নির্মম ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে আমাদের আজকের প্রতিবেদন।
যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন নীতির বলি হয়ে এবার ফেরত এলেন আরও ৩৯ বাংলাদেশি। তবে ফেরত আসার অভিজ্ঞতা ছিল হৃদয়বিদারক ও অসম্মানজনক—হাতকড়া ও পায়ে শেকল পরিয়ে তাদের পাঠানো হয়েছে ঢাকা। দীর্ঘ ৬০ ঘণ্টার এই যাত্রা যেন এক বন্দিশিবিরের রূপ নিয়েছিল। যারা আশ্রয়ের আবেদন করেছিলেন, তারা দেশে ফিরলেন ভীতিকর বন্দিদের মতো অপমানজনক অবস্থায়।
এই প্রথম নয়, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে বিভিন্ন দফায় বাংলাদেশিদের ফেরত পাঠিয়েছে।
তবে এবার যেটি আলাদা তা হলো—শারীরিকভাবে বেঁধে পাঠানো।
এর আগে মোট ১১৮ জনকে ফেরত পাঠানো হলেও কাউকে হাতকড়া বা শেকল পরানো হয়নি।
তাহলে হঠাৎ এই নিষ্ঠুরতা কেন?
ঢাকার জিনজিরার ফাহিম ও তার বাবা জুলহাস উদ্দিনের গল্পে উঠে আসে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি।
আশ্রয়ের আশায় ২০২৪ সালে কানাডা হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশ করেন তারা।
এরপর আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে আবেদনও করেন।
কিন্তু মার্কিন ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ সেই আবেদন খারিজ করে।
দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে তাদের ফেরত পাঠানো হয় হাতকড়া ও শেকল পরিয়ে, যেন তারা সন্ত্রাসী বা ভয়ঙ্কর অপরাধী।
ফাহিম বলেন,
“আমরা অপরাধী নই, আমরা তো আশ্রয় চেয়েছিলাম।
অথচ আমাদের সাথে এমন আচরণ করা হয়েছে, যা কোনো সভ্য সমাজে মেনে নেওয়া যায় না।”
না, এটি বৃহত্তর একটি সংকটের প্রতিফলন।
ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের শরিফুল হাসান বলেন,
“তারা কেউ কেউ ঘরবাড়ি বিক্রি করেছেন, কেউ ৩০-৪০ লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছাতে।
আশ্রয়ের আকাঙ্ক্ষায় তারা নিজেদের সর্বস্ব হারিয়েছেন।”
এত টাকা খরচ করে তারা যে পথে পাড়ি জমিয়েছেন, সেটি অনিয়মিত হলেও অধিকাংশই ছিল আন্তর্জাতিক মানবিক আইন দ্বারা সুরক্ষিত আশ্রয়প্রার্থীর পরিচয়ে।
কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অধীনে, অভিবাসন নিয়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
মানবাধিকারের পরোয়া না করে, নাগরিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে ফিরিয়ে দিচ্ছে ভয়ঙ্কর ও অসম্মানজনকভাবে।
২০২৫ সালের শুরুর দিকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে পুনরায় দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসন সংক্রান্ত তার পুরনো কড়া অবস্থানে ফিরে গেছেন।
তিনি ঘোষণা দেন,
“অবৈধ অভিবাসীদের কোনো আশ্রয় নেই।”
এরপর থেকেই ভারত, পাকিস্তান, ব্রাজিল ও বাংলাদেশসহ অনেক দেশের নাগরিকদের ফেরত পাঠানো শুরু হয়।
মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তীব্র সমালোচনা সত্ত্বেও বন্ধ হয়নি শারীরিকভাবে বেঁধে ফেরত পাঠানোর এই অমানবিক পদ্ধতি।
ইমিগ্রেশন পুলিশের একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, আগের দফাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
এমনকি বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকেও ফেরত পাঠানোর সময় সম্মানজনক ব্যবস্থার জন্য অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
তাহলে এবার কেন এই উল্টো আচরণ?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসন এখন আর মানবিক আলোচনায় আগ্রহী নয়।
বরং তারা একটি “শক্ত বার্তা” দিতে চায়: অবৈধ অভিবাসীদের কোনো জায়গা নেই—তাদের সঙ্গে বন্দিদের মতো আচরণই ভবিষ্যতের বার্তা।
যারা ফিরছেন, তারা শারীরিকভাবে ফিরে এলেও, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত।
তারা স্বপ্ন দেখেছিলেন নিরাপদ ভবিষ্যতের, কিন্তু ফিরে এলেন অপমানিত, সর্বস্ব হারিয়ে।
এ অভিজ্ঞতা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতা নয়, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অস্থিরতা, চাকরির অভাব, এবং বৈধ অভিবাসনের সুযোগের ঘাটতির ফলও।
বাংলাদেশ সরকারের উচিত, ফেরত আসাদের পুনর্বাসনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করা, এবং একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশের সঙ্গে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভবিষ্যতে আরও কূটনৈতিকভাবে শক্ত অবস্থান নেওয়া—যাতে মানুষ ‘অপরাধী নয়’, শুধুই ‘ভবিষ্যতের খোঁজে পাড়ি জমানো স্বপ্নদ্রষ্টা’ হিসেবে বিবেচিত হয়।
