ফরিদপুর থেকে মাত্র ১৭ জন যাত্রী নিয়ে ৬৭৬ আসনের বিশেষ ট্রেন ঢাকায় রওনা দিল। ব্যর্থ পরিকল্পনা নাকি লোক দেখানো আয়োজন?
ভবিষ্যৎ ইতিহাস যখন লিখবে, হয়তো এই ঘটনার কথা পাদটীকার জায়গাতেও আসবে না। কিন্তু এই উপেক্ষিত ঘটনাই অনবধানতাবশত উন্মোচন করে দিল রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, যোগাযোগ ব্যর্থতা ও জনপ্রত্যাশার একটি অদ্ভুত চিত্র—যেখানে একদিকে কোটি কোটি টাকার অবকাঠামো উন্নয়নের বুলি, অন্যদিকে ফরিদপুর থেকে ঢাকার উদ্দেশে মাত্র ১৭ জন যাত্রী নিয়ে যাত্রা করা বিশেষ ট্রেন।
৫ আগস্ট, মঙ্গলবার বেলা ১১টা ২৩ মিনিট।
ফরিদপুরের ভাঙ্গা স্টেশন থেকে ঢাকামুখী যাত্রা শুরু করে ৬৭৬ আসনের বিশাল বিশেষ ট্রেন।
ভেতরে যাত্রী মাত্র ১৭ জন।
স্টেশন মাস্টার জিল্লুর রহমানের ভাষায়, “অধিকাংশ বগিই ফাঁকা ছিল।”
এই ট্রেনটি ছিল তথাকথিত “জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠ” অনুষ্ঠানে অংশ নিতে আগ্রহীদের জন্য বরাদ্দ।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, ট্রেনটি ছিল প্রায় ফাঁকা, প্রহসনের পর্যায়ে যাওয়ার মতোই।
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বলছে,
জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে অতিবৃষ্টির কারণে যাত্রী আসা সম্ভব হয়নি।
এই ব্যাখ্যা কতটা গ্রহণযোগ্য?
বৃষ্টি তো জুলাই মাসে বাংলাদেশের একটি স্বাভাবিক আবহাওয়া চিত্র।
তাহলে তা আগাম পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত ছিল না কেন?
এছাড়া, স্থানীয়ভাবে কেউ জানলো কি আদৌ এই ট্রেনের খবর?
রেলওয়ে কীভাবে প্রচার করেছিল?
কী ছিল টিকিট বিক্রির পদ্ধতি?
এসব প্রশ্নের জবাব নেই।
সরকারি কর্মকাণ্ডে ‘লোক দেখানো কার্যক্রম’ নতুন কিছু নয়।
প্রশাসন বা রাজনৈতিক দলগুলো প্রায়ই জনসম্পৃক্ততা ও গণআন্দোলনের আবহ তৈরি করতে চায়, যেখানে বাস্তবে জনগণের সম্পৃক্ততা থাকে না।
এই ট্রেনের ঘটনাটি সেই ‘সিম্বলিক’ রাজনীতিরই আরেকটি নজির।
যেখানে জনগণের প্রয়োজন নয়, বরং একটি দৃশ্যমানতা (optics) তৈরি করাই মুখ্য ছিল।
৬৭৬ আসনের একটি পূর্ণ ট্রেন চালাতে রেলওয়ের যে জ্বালানি, জনবল, সময় এবং অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার ব্যয় হয়, তা কোনোভাবেই ১৭ জন যাত্রীর মাধ্যমে কাভার হয় না।
সরকারি অর্থের এমন অপচয় শুধু হাস্যকরই নয়, বরং উদ্বেগজনক।
যেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ গণপরিবহনে ঠাসাঠাসি করে যাতায়াত করে, সেখানে একটি প্রায় ফাঁকা ট্রেন শুধু রাজনৈতিক শোভাযাত্রা হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া দুর্ভাগ্যজনক।
এত বড় আয়োজন, অথচ জনগণের কোনো অংশগ্রহণ নেই—এটি রাজনীতির জন্য একটি ভীতিকর বার্তা।
৬৭৬ সিটের ট্রেনে যদি মাত্র ১৭ জন যাত্রী ওঠে, তাহলে ধরে নিতে হয়, আয়োজকদের সঙ্গে জনগণের আস্থা বা আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে।
এই disconnect সামান্য কোনো সংকেত নয়।
এটি হতে পারে আগামী দিনের রাজনীতির জন্য একটি ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইঙ্গিত—জনগণ আর সেই ‘নাটকীয়’ রাজনীতিতে অংশ নিচ্ছে না।
এই ঘটনায় কোনো অপরাধ ঘটেনি, কোনো মৃত্যু হয়নি, কোনো দোষীও হয়তো চিহ্নিত হবে না।
কিন্তু এটি ছিল রাষ্ট্র পরিচালনার একটি প্রতিচ্ছবি—যেখানে ‘জনগণ’ অনুপস্থিত, ‘গণমাধ্যম’ হয়তো প্রশ্ন করবে, কিন্তু ‘প্রশাসন’ নির্বিকার থাকবে।
এই ট্রেন ইতিহাসে লেখা হবে না। কিন্তু এর ফাঁকা বগিগুলো বলে যাচ্ছে, আরেকটি ইতিহাসের ইঙ্গিত—যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণের দূরত্ব দিন দিন বাড়ছে।
