চট্টগ্রাম বন্দরে দেড় কোটি টাকার কাপড়ভর্তি দুই কনটেইনার রহস্যজনকভাবে উধাও। ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ, নিরাপত্তা ব্যবস্থার প্রশ্নবিদ্ধ অবস্থা ও সম্ভাব্য সিন্ডিকেটের ছায়া নিয়ে বিশ্লেষণ।
চট্টগ্রাম বন্দর দক্ষিণ এশিয়ার তৃতীয় ব্যস্ততম সমুদ্রবন্দর। প্রতিদিন হাজারো কনটেইনার ওঠানামা করে, পণ্য খালাস হয়, নিলামে বিক্রি হয় কোটি কোটি টাকার মালামাল। এমন এক সুরক্ষিত স্থানে, যেখানে সেনা, নৌবাহিনী ও বন্দর কর্তৃপক্ষের কঠোর নজরদারি রয়েছে—সেখানে দেড় কোটি টাকার কাপড়ভর্তি দুইটি কনটেইনার রহস্যজনকভাবে ‘উধাও’ হয়ে যাওয়া কেবল একটি বাণিজ্যিক দুর্ঘটনা নয়; বরং এটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর গভীর প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে।
ফেব্রুয়ারিতে চট্টগ্রাম কাস্টমসের নিলামে শাহ আমানত ট্রেডিংয়ের মালিক সেলিম রেজা প্রায় ৮৫ লাখ টাকায় ২৭ টন ফেব্রিক্স কেনেন।
নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক, চার্জসহ এক কোটি সাত লাখ টাকা পরিশোধও করেন।
কিন্তু ডেলিভারির সময় গিয়ে দেখেন, কনটেইনারটি নেই।
ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এখনো এর হদিস মেলেনি।
সম্প্রতি আবারো নিলামে বিক্রি হওয়া ৪২ লাখ টাকার কাপড়ভর্তি আরেকটি কনটেইনারেরও কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে প্রায় দেড় কোটি টাকার পণ্য রহস্যজনকভাবে গায়েব।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা প্রশ্ন তুলেছেন—
“কনটেইনার বন্দরে নিরাপত্তা বলয়ের বাইরে গেল কিভাবে?”
“কাস্টমস ডেলিভারি অর্ডার দিল কীভাবে, যদি কনটেইনার না থাকে?”
“যেখানে সেনা ও নৌবাহিনীর নিরাপত্তা, সেখানেও কি কনটেইনার চুরি সম্ভব?”
সেলিম রেজা অভিযোগ করেছেন, সাত মাস ধরে কাস্টমসকে চিঠি দিয়েও কোনো সমাধান পাননি, অথচ তার ব্যবসা বন্ধ হওয়ার পথে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ দাবি করছে—
প্রতিদিন ৪৮-৪৯ হাজার কনটেইনার ওঠানামা করে, হয়তো হ্যান্ডলিংয়ের সময় অন্যত্র সরানো হয়েছে।
আবার কাস্টমস বলছে, পণ্য পাওয়া না গেলে রিফান্ড প্রক্রিয়া শুরু হবে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—
যদি সত্যিই রিফান্ড হয়, তবে ব্যবসায়ীর ক্ষতি কি শুধুই আর্থিক ক্ষতিপূরণে পূরণ হবে?
তার ব্যবসায়িক সুনাম, সময়, বাজারের প্রতিযোগিতা—এসব ক্ষতি কে পূরণ করবে?
বিশ্লেষকরা বলছেন, চট্টগ্রাম বন্দরে বহু বছর ধরেই ‘সিন্ডিকেট-রাজ’ চালু। কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে শুরু করে শুল্ক নির্ধারণ পর্যন্ত একটি অভ্যন্তরীণ চক্র প্রভাব বিস্তার করে।
এই ঘটনার পেছনে কি সেই চক্রের হাত রয়েছে?
নাকি এটি একটি প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা?
একটি দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থায় আস্থা হারানো মানে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় ধাক্কা।
যদি বন্দর থেকে কনটেইনার উধাও হয়, তবে আন্তর্জাতিক আমদানিকারকরা কতটা নিশ্চিত হতে পারেন যে তাদের পণ্য নিরাপদ থাকবে?
এর প্রভাব পড়বে রপ্তানি-আমদানির সুনামেও।
চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।
কেবল রিফান্ড দিয়ে দায় শেষ নয়—বরং উধাও হওয়া কনটেইনারগুলোর প্রকৃত হদিস বের করতে হবে।
অন্যথায় এই ঘটনাই প্রমাণ করবে, বন্দর আর কেবল বাণিজ্যিক কেন্দ্র নয়—বরং অন্ধকার সিন্ডিকেটের আঁতুরঘর হয়ে উঠছে।
