২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় মুফতি হান্নান, মাওলানা তাজউদ্দিন ও বিএনপি হাওয়া ভবনের যোগসূত্র উন্মোচন। পাকিস্তানি জঙ্গি মাজেদ ভাটের স্বীকারোক্তি ও তারেক রহমানের ভূমিকার বিশ্লেষণ।
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ঘটে যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। লক্ষ্য ছিল একটিই—শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতৃত্বকে নিশ্চিহ্ন করা। হামলার পেছনে ছিলেন আন্তর্জাতিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক, দেশীয় উগ্রপন্থী চক্র এবং রাজনৈতিক ক্ষমতালোভী বিএনপি–জামায়াত নেতৃত্ব।
হারকাতুল জিহাদ (হুজি-বি) প্রধান মুফতি আব্দুল হান্নান ছিলেন ২১ আগস্ট হামলার মূল সমন্বয়ক।
আফগানিস্তানে তালেবানদের হয়ে যুদ্ধ ও ট্রেনিং নেওয়া এই উগ্রপন্থী নেতা বাংলাদেশের ভেতরে একাধিক বড় হামলার পেছনে ছিলেন।

২০০০ সালে কোটালিপাড়ায় শেখ হাসিনার সমাবেশে বোমা পুঁতে হত্যার চেষ্টা
২০০৪ সালে সিলেটে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীর ওপর হামলা
২০০৫ সালে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এমএস কিবরিয়া হত্যা
জবানবন্দিতে হান্নান স্বীকার করেছিলেন—
শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্য তিনি অন্তত ১৯ বার চেষ্টা করেছেন, যার মধ্যে ৭ বার ছিল তার একক পরিকল্পনা।
হান্নানের ব্যক্তিগত “হত্যার স্বপ্ন” রাজনৈতিক মদতে পরিণত হয় হাওয়া ভবনে গিয়ে।
বিএনপির উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুর ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ছিলেন এই সেতুবন্ধনের প্রধান।
তিনি হান্নানকে নিয়ে যান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবরের কাছে।
২০০৪ সালের ১৫ আগস্ট হাওয়া ভবনে বসা বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন—
- তারেক রহমান
- আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ
- হারিস চৌধুরী
- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর
- ডিজিএফআইয়ের সাবেক প্রধান রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী
- ব্রিগেডিয়ার (অব.) আব্দুর রহিম
হান্নানের পরিকল্পনা শুনে তারেক রহমান সরাসরি অনুমোদন দেন এবং বাবর–পিন্টুর মাধ্যমে পরবর্তী যোগাযোগের নির্দেশ দেন।
হামলায় ব্যবহৃত আরজিএস মিলিটারি গ্রেড গ্রেনেড সরবরাহ করে পাকিস্তানের ইসলামাবাদভিত্তিক জঙ্গি নেতা আব্দুল মাজেদ ভাট।

তার জবানবন্দি থেকে বেরিয়ে আসে—
- পাকিস্তান থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে অস্ত্র ও গ্রেনেড আসে
- মাওলানা তাজউদ্দিন সেগুলো ঢাকায় এনে রাখতেন
- বিএনপি মন্ত্রিসভার সদস্য আব্দুস সালাম পিন্টুর ছত্রছায়ায় গ্রেনেড হামলার প্রস্তুতি হয়
পরে তাজউদ্দিনকে ভুয়া পাসপোর্টে পাকিস্তানে পালিয়ে পাঠানো হয়, ডিজিএফআই কর্মকর্তাদের সহযোগিতায়।
২০ আগস্ট মুফতি হান্নানের সহযোগীরা বঙ্গবন্ধু এভিনিউ এলাকায় রেকি করে।
পরদিন ২১ আগস্ট বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে শুরু হয় গ্রেনেড বর্ষণ।
হামলাকারীরা কয়েক দলে বিভক্ত হয়ে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালায়।
হামলাকারীদের মধ্যে ছিল জামায়াতে ইসলামী ও হুজি-বি’র সদস্যরা।
হামলায় নিহত হন আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদক আইভি রহমানসহ ২৪ জন।
শেখ হাসিনা অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে যান।
২০০৪-০৬ সালের মধ্যে বিএনপি সরকার হামলার দায় জঙ্গিদের ওপর চাপিয়ে মামলাকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার চেষ্টা করে।
এমনকি তাজউদ্দিনকে বিদেশে পাচার করে ষড়যন্ত্রের মূল সূত্র মুছে ফেলার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু ২০০৭ সালের সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে পুনঃতদন্তে বেরিয়ে আসে হাওয়া ভবনের সরাসরি সম্পৃক্ততা।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা শুধু একটি রাজনৈতিক সমাবেশে সন্ত্রাসী আঘাত ছিল না, বরং এটি ছিল রাষ্ট্রকে উগ্র ইসলামপন্থী ও পাকিস্তানি ধাঁচের ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার পরিকল্পনা।
বিএনপি–জামায়াত নেতৃত্বের সরাসরি আশ্রয়-প্রশ্রয়ে মুফতি হান্নানরা শুধু শেখ হাসিনাকে নয়, সমগ্র মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে হত্যার চেষ্টা করেছিল।
