বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমানের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, বিএনপি–জামায়াত–মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে তার বিতর্কিত অবস্থান এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ। কেন তার দুই নৌকায় পা দেওয়ার রাজনীতি আজ তাকে সংকটে ফেলেছে তা এই প্রতিবেদনে খতিয়ে দেখা হয়েছে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধপন্থী রাজনীতির ইতিহাসে অসংখ্য বীর মুক্তিযোদ্ধার নাম আজও গৌরবের সঙ্গে উচ্চারিত হয়। কিন্তু একইসঙ্গে কিছু মুক্তিযোদ্ধার দ্বিধাগ্রস্ত রাজনৈতিক অবস্থান তাদের ব্যক্তিগত অর্জনকে বিতর্কিত করেছে। এদের মধ্যে সাম্প্রতিক আলোচনায় উঠে এসেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট ফজলুর রহমান।
তিনি একদিকে শহীদ রাষ্ট্রপতিকে স্মরণ করে বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন, চেয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিচয়কে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে ব্যবহার করতে।
কিন্তু অন্যদিকে যুদ্ধাপরাধীদের দল জামায়াত-শিবির ও তাদের উত্তরসূরি শক্তি এনসিপির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।
রাজনীতির এ দ্বিমুখী অবস্থানকে সাধারণ মানুষ “দুই নৌকায় পা দেওয়া” আত্মঘাতী কৌশল হিসেবেই দেখছে।
রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদের সঙ্গে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের কারণে ফজলুর রহমান আওয়ামী লীগ থেকে সরে যান।
পরবর্তীতে মুক্তিযুদ্ধপন্থী সরকারের পতনের লক্ষ্যে বিরোধী শিবিরে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
তিনি প্রকাশ্যে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও বঙ্গবন্ধুর দৌহিত্র সজীব ওয়াজেদ জয়কে গালিগালাজ করেন এবং বলেছিলেন, আওয়ামী লীগের ‘আ’ লিখতে দশ বছর লাগবে।
কিন্তু ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা তার কল্পনার মতো হয়নি।
মুক্তিযোদ্ধার পরিচয়ে তিনি আবারও যুদ্ধাপরাধীদের সমালোচনা শুরু করেন।
এতে সাধারণ মানুষ তার ভেতরের মুক্তিযোদ্ধা মানুষটির প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে তার অবস্থানকে অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়েছে।
জুলাই মাসে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ফজলুর রহমানের মন্তব্য নতুন বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
তিনি আন্দোলনকারীদের ‘কালো শক্তি’ আখ্যা দেওয়ায় বিপ্লবী ছাত্রজনতা, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদসহ কয়েকটি সংগঠন তার গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে সেগুনবাগিচায় অবস্থান কর্মসূচি চালাচ্ছে।
বিএনপিও তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে।
আজকের সংকটই প্রমাণ করে, রাজনৈতিক জীবনে দ্বিমুখী অবস্থান দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতি করতে হলে যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রিত প্রধান দল বিএনপিতে থেকে তা সম্ভব নয়।
রাজাকারের নাতিপুতিরা তার বিচার দাবি করছে—কিন্তু মুক্তিযোদ্ধারা কি তার পক্ষে দাঁড়াচ্ছে?
এই প্রশ্ন আজ সামনে এসেছে।
এখনো সময় আছে ফজলুর রহমানের জন্য।
তিনি চাইলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতি রক্ষার শপথ নিয়ে বিএনপির ছায়া থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।
এতে যদি তার জীবনও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে, সেই মৃত্যু হবে একজন মুক্তিযোদ্ধার সম্মানজনক মৃত্যু।
অন্যথায় তিনি চিরকাল পরিচিত হবেন যুদ্ধাপরাধীদের আশ্রিত এক দ্বিমুখী রাজনীতিক হিসেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি আজো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বনাম যুদ্ধাপরাধীদের উত্তরসূরি শক্তির দ্বন্দ্বে আবদ্ধ।
এ দ্বন্দ্বে নিরপেক্ষ বা দুই নৌকায় পা দিয়ে চলার কোনো জায়গা নেই।
ফজলুর রহমানের ঘটনা সেই সত্যকেই আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
