নরসিংদীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হয়েছেন। রাজনৈতিক বিভাজন, অর্থনৈতিক আধিপত্য ও সহিংস সংস্কৃতির প্রেক্ষাপটে এ ঘটনার বিশ্লেষণ।
নরসিংদীর আলোকবালীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে একজন নিহত এবং অন্তত পাঁচজন আহত হওয়ার ঘটনাটি শুধু একটি বিচ্ছিন্ন সহিংসতা নয়, বরং দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে লুকিয়ে থাকা দীর্ঘস্থায়ী বিভাজন, আধিপত্যের রাজনীতি এবং স্থানীয় স্বার্থকেন্দ্রিক দ্বন্দ্বেরই প্রতিচ্ছবি। বৃহস্পতিবার (১৮ সেপ্টেম্বর) ভোরে আলোকবালী ইউনিয়নে বিএনপির আহ্বায়ক শাহ আলম চৌধুরী ও বহিষ্কৃত সদস্যসচিব আব্দুল কাইয়ুম মিয়ার অনুসারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে।
স্থানীয়দের মতে,
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকেই উভয় গ্রুপের মধ্যে দ্বন্দ্ব তীব্র হয়, যার মূল কারণ নদী থেকে বালু উত্তোলন, অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার।
সংঘর্ষ চলাকালে গুলিবিদ্ধ হয়ে ইদন মিয়া (৫৫), মুরাদনগর গ্রামের বাসিন্দা, হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান।
আহত অন্তত পাঁচজনকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
এই ঘটনাকে শুধুই দলীয় কোন্দল বলা যাবে না।
স্থানীয় পর্যায়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো যখন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে (যেমন বালু উত্তোলন, জমি দখল, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ) জড়িয়ে পড়ে, তখন রাজনৈতিক আদর্শ গৌণ হয়ে পড়ে এবং দলীয় আনুগত্য নির্ভর করে অর্থনৈতিক লাভ ও সামাজিক প্রভাবের উপর।
আলোকবালীতে বিএনপির দ্বন্দ্বের পেছনেও সেই স্বার্থের লড়াই প্রকটভাবে কাজ করেছে।
এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্য এক অশনিসংকেত
বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে বিষয়টি বারবার সামনে আসে, তা হলো—গণতান্ত্রিক বিরোধিতা নয়, বরং আধিপত্যের রাজনীতি।
ভেতরের বিরোধ রাজনৈতিক সহিংসতায় রূপ নেয়।
স্থানীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক লাভের জন্য দলের ভেতরে বিভাজন গভীর হয়।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব স্থানীয় পর্যায়ের সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হয়।
নরসিংদীর এই সংঘর্ষ তাই বিএনপির ভেতরের ভাঙনকে প্রকাশ করেছে,
কিন্তু একই সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সার্বিক দুর্বলতা ও সহিংস প্রবণতাকেও সামনে নিয়ে এসেছে।
নরসিংদী সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ এমদাদুল হক জানিয়েছেন,
পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি তাৎক্ষণিক রক্তপাত ঠেকাতে পারলেও, দীর্ঘমেয়াদে রাজনৈতিক বিরোধ সমাধান করতে পারে না।
নরসিংদীর এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের ভেতরকার দুর্বল গণতন্ত্র,
স্থানীয় পর্যায়ে অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং সহিংসতার চর্চাকে আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে।
বিএনপি যদি জাতীয় রাজনীতিতে শক্ত অবস্থান নিতে চায়, তবে প্রথমেই প্রয়োজন স্থানীয় পর্যায়ে বিভাজন নিরসন, স্বার্থকেন্দ্রিক রাজনীতিকে প্রতিহত করা এবং দলীয় ঐক্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
