২০২৪ সালের ৮ আগস্ট সুপ্রিম কোর্টের কথিত বিশেষ রেফারেন্স নিয়ে উঠেছে জালিয়াতির অভিযোগ। প্রধান বিচারপতি সেনানিবাসে থাকাকালীন এই আদেশ কীভাবে জারি হলো? রহস্য ঘিরে বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের আগস্ট মাস ছিল সবচেয়ে অস্থির সময়গুলোর একটি। ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়, তার সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয় সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কথিত এক আদেশ। “SPECIAL REFERENCE NO.01/2024” শিরোনামে প্রচারিত সেই আদেশটি আজ দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত একটি নথি।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—
এটি কি আসলেই সুপ্রিম কোর্টের আদেশ, নাকি রাষ্ট্রীয় বৈধতার ছদ্মবেশে তৈরি এক জাল নথি?
আদেশে দাবি করা হয়েছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করেছেন।
অথচ রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন—হাসিনা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেননি।
পদত্যাগপত্রের প্রমাণ ছাড়া আদালত কীভাবে সাংবিধানিক মতামত দিলো—এই প্রশ্ন থেকেই সন্দেহ ঘনীভূত হয়।
৮ আগস্ট দেশ ছিল কার্যত স্থবির।
প্রশাসন থেকে মন্ত্রণালয় সব জায়গায় বিশৃঙ্খলা।
এমন পরিস্থিতিতে সুপ্রিম কোর্টে শুনানি বা মতামত প্রদানের মতো প্রক্রিয়া ঘটেছে বলে কোনো আইনজীবী অবগত নন।
তাছাড়া, আইন মন্ত্রণালয় বন্ধ থাকাকালীন সময়ে রাষ্ট্রপতির রেফারেন্স কোর্টে পাঠানো হয়েছিল কীভাবে—সে প্রশ্নও আজো উত্তরহীন।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ এসেছে বিচারপতিদের অবস্থান নিয়ে।
৮ আগস্টের সেই সময়ে প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানসহ কয়েকজন বিচারপতি নিরাপত্তার কারণে সেনানিবাসে অবস্থান করছিলেন।
তারা তখন আদালতে বসে আদেশ লেখার অবস্থায় ছিলেন না।
অনলাইন শুনানির প্রমাণও কোথাও নেই।
তাহলে এই নথি তৈরি করলো কে?
সুপ্রিম কোর্টে প্রতিটি মামলার নিজস্ব ফাইল থাকে।
অথচ এই বিশেষ রেফারেন্সের কোনো নথি বা কেস নম্বর কোর্ট রেকর্ডে পাওয়া যাচ্ছে না।
যা থেকে স্পষ্ট সন্দেহ জাগছে—এটি আদালতের প্রাতিষ্ঠানিক নথি নয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আদেশটির ভাষা, বিন্যাস ও উপস্থাপনা আদালতের সাধারণ রায় বা মতামতের মতো নয়।
সুপ্রিম কোর্ট সাধারণত বিস্তারিত আইনগত ব্যাখ্যা, সাংবিধানিক প্রসঙ্গ ও রেফারেন্স যুক্ত করে থাকে।
কিন্তু এখানে সেসবের কিছুই নেই।
অনেকে মনে করছেন, ৫ আগস্ট সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বৈধতা প্রতিষ্ঠার জন্যই এই জাল নথি তৈরি করা হয়েছে।
এটি যদি সত্যি হয়, তবে বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে এটি হবে এক নজিরবিহীন প্রতারণা।
এই রহস্যময় রেফারেন্সকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে উত্তপ্ত আলোচনা।
দেশের মানুষ এখন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে—
যদি বিচারপতিরা সেনানিবাসে থাকেন, তাহলে ৮ আগস্টের সেই আদেশ কে দিলো?
সুপ্রিম কোর্ট বা রাষ্ট্রপতির দপ্তর এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু বলেনি।
অথচ এ বিষয়ে স্বচ্ছ তদন্ত ও প্রকৃত সত্য প্রকাশ করা আজ রাষ্ট্রের আস্থার প্রশ্নে জরুরি হয়ে উঠেছে।
