নাফ নদে আরাকান আর্মির হাতে ১১৬ বাংলাদেশি জেলে আটক, ১১১ জনের ফেরার পথ অনিশ্চিত। সীমান্ত অস্পষ্টতা, প্রশাসনিক অক্ষমতা ও আরাকান আর্মির আগ্রাসনে নাফ নদ এখন মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।
নাফ নদ—যা একসময় ছিল জীবিকার প্রতীক—আজ হয়ে উঠেছে ভয়ের নাম। এই নদ বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে টেকনাফ থেকে সেন্টমার্টিন পর্যন্ত বিস্তৃত, যেখানে প্রতিদিন শত শত জেলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে জাল ফেলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই জালেই জড়াচ্ছে মৃত্যু, বন্দিত্ব আর অপহরণের কাহিনি। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসে আরাকান আর্মির হাতে ১১৬ বাংলাদেশি জেলে আটক হয়েছেন—এমন তথ্য দিয়েছে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসন।
বিজিবির হিসাবে, চলতি বছরেই মোট ২৩৫ জন জেলে আরাকান আর্মির হাতে পড়েছেন।
তাদের মধ্যে ১২৪ জন ফিরে এলেও এখনো ১১১ জন বন্দি অবস্থায় রয়েছেন, যাদের মধ্যে ৬২ জন রোহিঙ্গা জেলে।
এই ঘটনা কেবল একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি বাংলাদেশের সীমান্তবাসীর অনিশ্চিত জীবনের নির্মম চিত্র।
ফেরত আসা জেলেরা জানিয়েছেন,
আরাকান আর্মির হাতে তারা ভোগ করেছেন অকথ্য নির্যাতন—হাত-পা বেঁধে রাখা, দিনে দুইবার মারধর, এমনকি কলাগাছ সিদ্ধ করে খেতে বাধ্য করা।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশি জেলেদের আটক তিনটি উদ্দেশ্য পূরণ করছে—
নিরাপত্তাজনিত সন্দেহ: জান্তা সরকারের বিমান হামলার আশঙ্কায় আরাকান আর্মি নৌপথে নজরদারি বাড়িয়েছে।
অর্থনৈতিক লুণ্ঠন: খাদ্য ও পণ্যের সংকটে থাকা আরাকান অঞ্চলে মাছ, জাল ও বোট ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে জীবিকা নির্বাহের উপায় হিসেবে।
রাজনৈতিক কূটকৌশল: বাংলাদেশি নাগরিকদের আটক করে আরাকান আর্মি কার্যত নিজেদের ‘বৈধ কর্তৃপক্ষ’ হিসেবে স্বীকৃতি আদায়ের কূটচাল চালাচ্ছে।
এই সংকটের পেছনে অন্যতম কারণ হলো নাফ নদে স্পষ্ট সীমারেখার অভাব।
অনেক সময় জোয়ারের পানিতে বোট ভেসে মিয়ানমারের দিকে চলে যায়, কখনও বা মাছের আশায় জেলেরা ইচ্ছে করেই ঢুকে পড়েন।
টেকনাফের ইউএনও স্বীকার করেছেন—
“অন্য দেশের সমুদ্রসীমায় তো আমি যেতে পারি না”—অর্থাৎ বাংলাদেশের প্রশাসনের হাতে সীমান্তের বাইরে কোনো কার্যকর পদক্ষেপের সুযোগ নেই।
অন্যদিকে সীমান্তের ওপারে এখন কার্যত কোনো স্বীকৃত সরকার নেই।
আরাকান জান্তা-শূন্য এলাকা, যেখানে আরাকান আর্মিই বাস্তব শাসক।
ফলে আটক জেলেদের উদ্ধারে কূটনৈতিকভাবে তৎপর হওয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
সীমান্তের মানবিক বিপর্যয়
টেকনাফ ও সেন্টমার্টিনের শতাধিক পরিবার এখন শোক ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছে।
কারও স্বামী, কারও ছেলে, কারও পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সদস্য বন্দি।
সন্তানদের পড়াশোনা বন্ধ, বৃদ্ধা মায়েরা অসুস্থ, ঘরে ঘরে কান্না আর অপেক্ষা।
ষাটোর্ধ্ব মদিনা বেগমের চার ছেলেকে ধরে নিয়ে গেছে আরাকান আর্মি।
তিনি বলেন, “সন্তানদের চিন্তায় আমি অসুস্থ হয়ে পড়েছি।
আমার একটাই দাবি—যে কোনো মূল্যে তারা যেন আমার কোলে ফিরে আসে।”
এই একটি বাক্যেই লুকিয়ে আছে নাফ নদ-তীরের শতাধিক পরিবারের যন্ত্রণা—একটি সীমান্ত, যেখানে রাষ্ট্রের আইন শেষ হয়ে যায়, আর মানবিকতার কান্না শুরু হয়।
প্রতিটি মাছধরা অভিযানে একটি ট্রলার চালাতে লাগে ২০ লাখ থেকে দেড় কোটি টাকা পর্যন্ত।
মাছ না ধরতে পারলে লোকসানের ভার জেলে ও মালিক উভয়কেই টানতে হয়।
এখন জেলেরা বলছেন, “আরাকান আর্মির ভয় থাকলে নদীতে নামা অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
যদি এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকে, তাহলে নাফ নদ তীরবর্তী জেলাশিল্প ও উপকূলীয় অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়বে।
আজ নাফ নদ শুধুই সীমান্তের প্রাকৃতিক রেখা নয়, এটি হয়ে উঠেছে রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা ও মানবিক বিপর্যয়ের প্রতীক।
মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধ, আরাকান আর্মির ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এই নদ আজ মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এখন সবচেয়ে জরুরি—
আরাকান আর্মির সঙ্গে আন্তর্জাতিক মাধ্যমে মানবিক আলোচনার উদ্যোগ,
জেলেদের জন্য নিরাপদ মাছ ধরার অঞ্চল নির্ধারণ,
এবং নাফ নদ সীমান্তে যৌথ টহল ব্যবস্থার কূটনৈতিক প্রয়াস।
যদি তা না হয়, তাহলে নাফ নদ শুধু সীমান্ত নয়—একটি দেশের মানবতার ইতিহাসে অমোচনীয় ব্যর্থতার প্রতীক হয়ে থাকবে।
