জাতিসংঘের বাজেট সংকটে শান্তিরক্ষা মিশন থেকে আরও ১,৩১৩ বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপে কূটনৈতিক প্রভাব, সামরিক অবস্থান ও ভবিষ্যৎ কৌশল নিয়ে বিশ্লেষণ।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ শুধু সেনা প্রেরণ নয়, বরং দেশের কূটনৈতিক অবস্থান ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রতীক। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তর থেকে পাঠানো একটি চিঠি সেই প্রভাবের ভারসাম্যে নড়চড় সৃষ্টি করেছে। চিঠি অনুযায়ী, আগামী নয় মাসে বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের মোট শান্তিরক্ষীর সংখ্যা কমানো হবে—এ প্রক্রিয়ায় ১,৩১৩ বাংলাদেশি সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সদস্য দেশে ফিরবেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে ১৫ শতাংশ বাজেট হ্রাস পরিকল্পনা বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।
এর ফলে, ইউনিফর্মধারী সদস্যদের জন্য বরাদ্দ অর্থ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাচ্ছে।
বাস্তবিক অর্থে, এর মানে হচ্ছে—মাঠপর্যায়ে শান্তিরক্ষীদের সংখ্যা হ্রাস।
ওএমএ’র চিঠিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে এই সিদ্ধান্ত কোনো দেশের প্রতি আস্থাহীনতার প্রতিফলন নয়, বরং সম্পূর্ণ আর্থিক সংকট মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তা থেকে নেওয়া হয়েছে।
এই সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে দক্ষিণ সুদান (UNMISS)-এর ওপর, যেখান থেকে ৬১৭ সদস্যকে ফিরিয়ে আনা হবে।
অন্যদিকে,
- মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র (MINUSCA) থেকে ৩৪১ জন,
- সুদানের আবেই (UNISFA) থেকে ২৬৮ জন,
- কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র (MONUSCO) থেকে ৭৯ জন,
- এবং পশ্চিম সাহারা (MINURSO) থেকে ৮ জনকে ফিরিয়ে আনা হবে।
এর পাশাপাশি, বাংলাদেশ পুলিশের ১৮০ সদস্যের কঙ্গো কন্টিনজেন্ট—যার মধ্যে ৭০ জন নারী অফিসার—নভেম্বরের মধ্যেই দেশে ফিরে আসবেন।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট ফর পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) জ্যেষ্ঠ ফেলো শাফকাত মুনীর যথার্থভাবেই বলেছেন—“এটি কেবল একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ নয়, বরং একটি কৌশলগত সংকেত।”
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রথম দুই শীর্ষ সেনা প্রেরণকারী দেশের মধ্যে অবস্থান ধরে রেখেছে।
এই অবস্থান শুধু সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্বের প্রমাণ নয়, বরং বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি শক্ত স্তম্ভ।
তবে মিশন কাঠামো সংকুচিত হলে, আগের সংখ্যা বজায় রাখা সম্ভব নাও হতে পারে।
এই অবস্থায় বাংলাদেশকে নতুনভাবে “ভ্যালু যোগ” করতে হবে—যেমন সিনিয়র পদে নিয়োগ, নীতি প্রণয়ন বা পরিকল্পনা পর্যায়ে অংশগ্রহণ।
শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের ঐতিহাসিক অবদান
বাংলাদেশ ১৯৮৮ সালে মাত্র ১৫ জন পর্যবেক্ষক পাঠিয়ে এই যাত্রা শুরু করে।
এরপর থেকে ৬৩টি মিশনে ১ লাখ ৭৮ হাজারেরও বেশি শান্তিরক্ষী দায়িত্ব পালন করেছেন।
বর্তমানে ৫,৬১৯ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী ১০টি দেশে দায়িত্বে রয়েছেন।
এদের মধ্যে অনেকে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বা লজিস্টিক বিভাগেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।
বিশেষ করে নারী শান্তিরক্ষীদের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও উজ্জ্বল করেছে।
শান্তিরক্ষী সংখ্যা হ্রাস মানেই প্রভাব হারানো নয়।
বরং এটি হতে পারে নতুন কৌশল সাজানোর সুযোগ।
বাংলাদেশ চাইলে —
- জাতিসংঘের প্রশিক্ষণ, লজিস্টিক ও নীতি-নির্ধারণ পর্যায়ে অংশ নিতে পারে,
- সাইবার সিকিউরিটি, জলবায়ু নিরাপত্তা, ও মানবিক পুনর্গঠন সম্পর্কিত বিশেষায়িত ইউনিট গঠনে নেতৃত্ব দিতে পারে,
- এবং আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় বহুপাক্ষিক উদ্যোগে অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারে।
জাতিসংঘের বাজেট সংকট হয়তো সাময়িক, কিন্তু এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক—বাংলাদেশকে এখন কেবল সৈন্য প্রেরণকারী দেশ নয়, বরং শান্তিরক্ষা নীতির নকশাকারী অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে।
এখন সময় নতুন কৌশল ও নতুন মূল্য সংযোজনের, যাতে “নীল হেলমেট” পরা প্রতিটি বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী শুধু মাঠে নয়, নীতিনির্ধারণের টেবিলেও নিজের প্রভাব বিস্তার করতে পারেন।
