বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টদের হত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (ICC) মামলা দায়ের করেছে লন্ডনের একটি আইন প্রতিষ্ঠান। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা, দায়মুক্তি সংস্কৃতি এবং আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের প্রেক্ষাপটে কী বার্তা দিচ্ছে— বিশ্লেষণ এই প্রতিবেদনে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় উন্মোচিত হলো যখন লন্ডনের ডাউটি স্ট্রিট চেম্বার্সের আইনজীবী স্টিভেন পাওলস কেসি আওয়ামী লীগের পক্ষে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (ICC) প্রসিকিউটরের কাছে অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শত শত নেতা-কর্মী হত্যা, আটক ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন— যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, “অপারেশন ডেভিল হান্ট” নামে এক অভিযানে মাত্র ১২ দিনে ১৮,০০০ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।
তাদের মধ্যে রাজনীতিবিদ, বিচারক, সাংবাদিক, অভিনেতা থেকে শুরু করে সাধারণ সমর্থকও ছিলেন।
এমনকি হেফাজতে ২৫ জন আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুর ঘটনাও রিপোর্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে— যাদের মৃতদেহে ‘নির্যাতনের চিহ্ন’ পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ।
এই প্রেক্ষিতে লন্ডনের আইনজীবী দল যুক্তি দিয়েছে যে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসব ঘটনার ন্যায্য তদন্ত বা বিচারের কোনো বাস্তবসম্মত সম্ভাবনা নেই,
কারণ অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন ১৪ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে একতরফা দায়মুক্তির আদেশ জারি করে।
বাংলাদেশ ২০১০ সালে রোম সংবিধি অনুমোদন করে, যা আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ওপর মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক দায়িত্ব আরোপ করে।
ফলে, যদি আদালত মনে করে যে দেশের অভ্যন্তরে ন্যায়বিচার ব্যাহত হচ্ছে, তবে আইসিসি নিজস্ব এখতিয়ারে তদন্ত শুরু করতে পারে।
এই কারণেই স্টিভেন পাওলস কেসির দল মনে করছে যে, আইসিসির প্রসিকিউটর কারিম খান বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে প্রাথমিক তদন্ত শুরু করার যৌক্তিকতা রাখেন।
প্রতিশোধ নাকি ন্যায়বিচার?
২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের পর থেকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে “আওয়ামী ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা”র নামে অভিযান শুরু হয়।
কিন্তু বাস্তবে সেই অভিযান কি রাজনৈতিক প্রতিশোধে রূপ নিয়েছিল?
মানবাধিকার সংগঠনগুলো এবং আন্তর্জাতিক মিডিয়া একে “selective justice” বলে আখ্যায়িত করেছে।
আওয়ামী লীগ দাবি করছে— এটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অন্যদিকে বর্তমান প্রশাসন বলছে এটি “ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রক্রিয়া।”
আইসিসিতে এই ধরনের অভিযোগ দায়েরের ঘটনা শুধু বাংলাদেশের জন্য নয়, পুরো দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের জন্যই অভূতপূর্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ।
কারণ, এটি প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক দমন-পীড়নের বিষয়কে আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার আওতায় নিয়ে আসছে।
যদি আইসিসি এই অভিযোগ গ্রহণ করে, তবে তদন্তের আওতায় আসতে পারে সরকারি প্রশাসন, সামরিক কর্মকর্তাসহ রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিভিন্ন স্তর।
এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আদালতের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের সার্বভৌম বিচারিক ব্যবস্থার ওপর নতুন প্রশ্ন তুলবে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক সহিংসতা ও দমন-পীড়নের ঘটনায় দায়মুক্তি সংস্কৃতি গভীরভাবে প্রোথিত।
প্রতিটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘অভিযান’ চালানো একধরনের রাজনৈতিক বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক আদালতের এই পদক্ষেপ যেন একটি ‘সতর্কবার্তা’, যে— রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রদত্ত দায়মুক্তি আন্তর্জাতিক আইনের চোখে বৈধতা পায় না।
আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে আওয়ামী লীগের পক্ষে দায়ের করা এই অভিযোগ শুধু একটি আইনি পদক্ষেপ নয়,
এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের ভবিষ্যতের এক মাইলফলক হতে পারে।
যদি আদালত প্রাথমিক তদন্তে যথেষ্ট প্রমাণ পায়, তবে এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম আন্তর্জাতিক বিচারিক হস্তক্ষেপ হিসেবে চিহ্নিত হবে—
যা রাষ্ট্র ও রাজনীতির গতি প্রকৃতিকে দীর্ঘমেয়াদে বদলে দিতে পারে।
