চার মাস ধরে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সাক্ষাৎ না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান বাবু। পোশাক খাতের উদ্বেগ, অর্থনীতির বাস্তবতা এবং সরকারের নীতির দূরত্ব নিয়ে বিশ্লেষণ।
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত—পোশাক শিল্প। বছরে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয়ে দেশের অর্থনীতিকে টিকিয়ে রাখে এই খাত। অথচ এই খাতের প্রতিনিধিদের সঙ্গে সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক পর্যায়ে কথাবার্তা হচ্ছে না—এটা নিঃসন্দেহে এক উদ্বেগজনক সংকেত।
বিজিএমইএ প্রেসিডেন্ট মাহমুদ হাসান খান বাবু যখন বলেন,
“১০০ মিলিয়ন ডলারের কোম্পানি স্টারলিংকের ভাইস প্রেসিডেন্টে লেভেলের লোক এলে উনি সময় দেন, কিন্তু ৪০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক খাতকে দেন না,”—
এটা শুধু ক্ষোভ নয়, এক ধরনের নীতিগত অসামঞ্জস্যের প্রতিফলনও বটে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্বে থাকা ড. মুহাম্মদ ইউনূস আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যস্ত সময় পার করছেন—
নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ হিসেবে তাঁর বৈদেশিক সফর, আন্তর্জাতিক আলোচনায় অংশগ্রহণ ও বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের উদ্যোগ আলোচনায় আছে।
কিন্তু ঘরের ভেতরের বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, দেশীয় শিল্পখাতের সঙ্গে যোগাযোগের ঘাটতি ক্রমেই স্পষ্ট হচ্ছে।
একটি সরকার যখন নীতিগত স্থিতিশীলতা বা শিল্পখাতে আস্থা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করে, তখন বাণিজ্য সংগঠনগুলোর সঙ্গে নিয়মিত নেগোসিয়েশন অপরিহার্য।
সেই নেগোসিয়েশনের জায়গাটিই এখন শূন্য।
বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ–র বক্তব্যে স্পষ্ট—তারা সরকারের সঙ্গে শুধু যোগাযোগ নয়, বরং আলোচনার সুযোগটাই পাচ্ছেন না।
চট্টগ্রাম বন্দরের মাশুল ও টার্মিনাল ইফিসিয়েন্সি বিষয়ে বিকেএমইএ সভাপতি হাতেম বলেন, “বিদেশিদের দিলে কস্ট কমার কথা, বাড়ার তো নয়।”
এই মন্তব্যে বোঝা যায়, ব্যবসায়ীরা এখন সরকারের নীতিনির্ধারণে ‘ইনপুটহীন’ হয়ে পড়েছেন।
বাংলাদেশের পোশাক খাত বর্তমানে একাধিক চাপে রয়েছে—
- বৈদেশিক ক্রেতাদের নতুন শর্ত,
- ডলার সংকট ও আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি,
- এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা।
এর মধ্যে সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ব্যর্থ হওয়া মানে হলো, সমস্যার সমাধানের পথ আরও জটিল হয়ে যাওয়া।
ড. ইউনূসের নেতৃত্বে ব্যবসায়িক বিশ্বাসের সংকট
প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ড. ইউনূসের মূল শক্তি ছিল বিদেশে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা।
কিন্তু দেশের ব্যবসায়ী মহলে তাঁর প্রতি আস্থার সংকট বাড়ছে—বিশেষত যেভাবে শিল্পখাতের প্রতিনিধি সংগঠনগুলো উপেক্ষিত বোধ করছে।
প্রশ্ন উঠছে—‘ইউনূস সরকার’ কি আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড ইমেজে বেশি মনোযোগী, না দেশের বাস্তব অর্থনীতিতে?
বাংলাদেশের পোশাক খাত শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক শক্তিরও প্রতীক।
ইউরোপ, আমেরিকা ও এশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের অবস্থান টেকসই রাখতে হলে এই খাতকে রাজনীতির বাইরে রেখে নীতিগত অগ্রাধিকার দিতে হবে।
বিজিএমইএ প্রেসিডেন্টের ক্ষোভ একদিনের নয়—এটা আসলে সেই অব্যক্ত অসন্তোষের প্রকাশ, যা দেশের অর্থনীতির ভেতর থেকে ধীরে ধীরে ফুঁসছে।
