ঝিনাইদহে বিএনপি নেতার ছেলের বিরুদ্ধে হিন্দু নারীদের ঘর থেকে তুলে নিয়ে নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীরা প্রশাসনের দ্রুত পদক্ষেপ চেয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক | ঝিনাইদহ |
ঝিনাইদহ জেলার কালিচরণপুর ইউনিয়নের উত্তর কাষ্টসাগরা গ্রামে হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েকজন নারীকে ঘর থেকে তুলে নিয়ে নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, এই ভয়াবহ ঘটনায় স্থানীয় বিএনপি নেতা রেজাউল করিমের ছেলে নিলয় করিম সরাসরি জড়িত।
সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আতঙ্ক
গ্রামের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ এখন আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের ভাষ্য, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে রাতে কয়েকজন যুবক গ্রামের বিভিন্ন হিন্দু পরিবারের বাড়িতে হানা দেয়, নারীদের জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায় এবং পরে ছেড়ে দেয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা জানান,
“প্রতিবারই ভয় দেখিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। আমরা বাধা দিলে আমাদেরও মারধর করা হয়। অভিযুক্তদের মধ্যে নিলয় ছিল—সবাই জানে, কিন্তু কেউ মুখ খোলে না।”
তারা আরও জানান, প্রশাসনের কাছে একাধিকবার অভিযোগ জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
প্রতিবাদে হিন্দু সম্প্রদায়ের অবস্থান
ঘটনার প্রতিবাদে শনিবার সকালে ঝিনাইদহ সদর থানার সামনে অবস্থান নেন স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের কয়েক ডজন নারী-পুরুষ। তারা অভিযুক্ত নিলয় করিম ও তার সহযোগীদের গ্রেফতার এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানান।
অবস্থানকারীদের একজন বলেন,
“আমরা ন্যায়বিচার চাই। শুধু ধর্ম দেখে কেউ যেন বিচার থেকে বঞ্চিত না হয়।”
প্রতিবাদকারীরা এসময় “হিন্দু জীবনের নিরাপত্তা চাই” ও “অপরাধীর বিচার হোক” স্লোগান দেন।
অভিযুক্ত পরিবারের প্রভাবশালী অবস্থান
স্থানীয় সূত্র জানায়, নিলয় করিমের বাবা রেজাউল করিম দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং এলাকায় প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।
তার পরিবারের প্রভাবের কারণেই স্থানীয় প্রশাসন নিষ্ক্রিয় ভূমিকা নিচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
একজন স্থানীয় শিক্ষক বলেন,
“যতক্ষণ পর্যন্ত রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত না হবে, ততক্ষণ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না।”
প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
এই বিষয়ে ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)-এর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।
তবে জেলা পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“বিষয়টি আমরা জেনেছি, অভিযোগ পেলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, এ ধরনের ঘটনার দ্রুত বিচার না হলে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সামাজিক প্রেক্ষাপট ও বিশ্লেষণ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নারীদের ওপর এই ধরনের সহিংসতা রাজনৈতিক সুরক্ষার বলয়ে থাকা অপরাধীদের দুঃসাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে।
একই সঙ্গে, স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতির ভিত্তি নড়বড়ে করছে।
এক মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিনিধি বলেন,
“যদি দ্রুত ব্যবস্থা না নেওয়া হয়, তাহলে এই ঘটনা অন্য এলাকায়ও প্রভাব ফেলবে এবং সংখ্যালঘুদের ওপর ভয়-ভীতির সংস্কৃতি আরও শক্তিশালী হবে।
পর্যবেক্ষণ
ঝিনাইদহের এই ঘটনা কেবল একটি গ্রামের ঘটনা নয়, বরং পুরো দেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা।
যেখানে রাজনীতির ছায়ায় অপরাধের আশ্রয় মেলে, সেখানে আইনের শাসন দুর্বল হয়, আর সংখ্যালঘুর নিরাপত্তা সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
এখন দেখার বিষয়—প্রশাসন কি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনতে পারে, নাকি আবারও প্রভাবশালী পরিবারের ছায়ায় ন্যায়বিচার চাপা পড়ে যাবে?
