দেশের কারাগারে আওয়ামী লীগ কর্মীদের রহস্যজনক মৃত্যু বাড়ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে— এটি পরিকল্পিত নিপীড়নের ইঙ্গিত হতে পারে।
গত এক বছরে আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনের অন্তত ২৬ জন নেতাকর্মী কারাগারে, পুলিশের হেফাজতে বা অভিযানের সময় নিহত হয়েছেন। পরিবারগুলো বলছে— এসব মৃত্যু “স্বাভাবিক নয়”, বরং পরিকল্পিতভাবে নির্যাতন বা বিষ প্রয়োগের ফল।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোও বলছে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি কারাগারগুলোতে এক ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় তৈরি করছে।
কারাগারে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দি
বর্তমানে দেশের ৬৮টি কারাগারে বন্দি সংখ্যা ৮০ হাজারের বেশি, যেখানে ধারণক্ষমতা মাত্র ৪৬ হাজার। কারা অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, ৭৩.৭৫% বন্দির বিচার এখনো শেষ হয়নি।
আইনজীবীরা বলছেন, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ‘মিথ্যা মামলা’ এবং দীর্ঘ মেয়াদে জামিন অস্বীকারের কৌশল এখন ‘নতুন রাজনৈতিক অস্ত্র’ হয়ে উঠেছে।





কারাগারে মৃত্যুর অস্বাভাবিক ধারা: “হার্ট অ্যাটাক না বিষ প্রয়োগ?”
সাম্প্রতিক সময়ে যেসব আওয়ামী লীগ কর্মী কারাগারে মারা গেছেন, তাদের অনেকেরই মৃত্যুর কারণ হিসেবে পুলিশ বলেছে “হার্ট অ্যাটাক”।
কিন্তু পরিবার ও সহকর্মীরা দাবি করছেন, এটি সাজানো গল্প— কারণ একই ধরনের মৃত্যু বারবার ঘটছে, এবং সব ক্ষেত্রেই শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল না।
“ডিজিটালিস” নামের এক নিখুঁত বিষের ছায়া
বিশেষজ্ঞ সূত্র জানায়, ডিজক্সিন (Digoxin) নামের এক ওষুধ—যা হৃদরোগ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়—অতিরিক্ত মাত্রায় খাওয়ালে কয়েক দিনের মধ্যে মৃত্যুঘটাতে পারে।
ফরেনসিক টেস্ট ছাড়া এটি প্রাকৃতিক হার্ট অ্যাটাক বলে মনে হয়। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, এই ধরনের “কেমিকেল টক্সিন” বন্দিদের খাবারে মিশিয়ে দেওয়া হচ্ছে—যাতে মৃত্যু প্রাকৃতিক মনে হয়।
মৃত্যু যাদের, তাদের নাম ভুলে যাওয়া যাবে না
জাতীয় দৈনিক ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের রিপোর্ট অনুযায়ী—
- বগুড়ায় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল মতিন ওরফে মিঠু মারা যান কারাগারে “হার্ট অ্যাটাকে”।
- এর কিছুদিন পর অধ্যক্ষ শাহাদত আলম ঝুনু মারা যান “চিকিৎসার পথে”।
- ডিসেম্বরে চারজন আওয়ামী লীগ নেতার হার্ট অ্যাটাকে মৃত্যু হয় বগুড়া কারাগারে।
পরিবারের দাবি, তারা সকলে রাজনৈতিকভাবে টার্গেটেড ছিলেন।
“বিচারহীনতা কারাগারকে করেছে মৃত্যুকূপ”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিদ ড. তৌহিদুল হক বলেন,
“কারাগারে বন্দি রেখে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা যায় না। বিচার দীর্ঘসূত্রতা এখন কারাগারের সবচেয়ে বড় মানবাধিকার সংকট।”
তিনি আরও বলেন,
“যাদের বিচারই শুরু হয়নি, তাদের বছরের পর বছর আটকে রাখা এবং পরে ‘হার্ট অ্যাটাক’ বলে দায় এড়ানো—এটি বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ভেঙে দিচ্ছে।”
মানবাধিকার পরিস্থিতির ভয়াবহ ইঙ্গিত
মানবাধিকার সংস্থা ও পর্যবেক্ষকরা বলছেন—
এই ধরনের অস্বাভাবিক মৃত্যু একটি রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে।
যদি সত্যিই পরিকল্পিত হয়, তাহলে এটি শুধু এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, বরং রাষ্ট্রের বিচার ও মানবাধিকারের মূল কাঠামোর ওপর আঘাত।
তারা সরকারের কাছে দাবি তুলেছেন—
“স্বচ্ছ, স্বাধীন ও আন্তর্জাতিক মানের তদন্ত” নিশ্চিত করতে হবে যেন এসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন হয়।
মন্তব্য
বাংলাদেশের কারাগার এখন শুধু বন্দিদের আবাস নয়, বরং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ও মানবতার পরীক্ষার জায়গা।
যদি রাজনৈতিক বন্দিদের রহস্যজনক মৃত্যু সত্যিই ঘটে থাকে, তবে তা শুধু একদল বা সরকারের জন্য নয়, সারা জাতির জন্য এক ভয়ঙ্কর ইঙ্গিত।
