কাশিমপুর কারাগারে বন্দিদের খাবারে কেমিক্যাল মিশ্রণ ও নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। মানবাধিকার সংস্থার জরুরি তদন্ত ও নজরদারির দাবি।
বাংলাদেশের কারাগার ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কারাগারগুলোতে রাজনৈতিক বন্দিদের ওপর অমানবিক নিপীড়ন এবং পরিকল্পিতভাবে বিষপ্রয়োগের মাধ্যমে তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ উঠেছে যে, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস সরকারের নির্দেশেই এই ‘জেলহত্যা’ হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ও বন্দিদের পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ উঠেছে—কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজনৈতিক বন্দিদের খাবারে রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধন করছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তাদের অভিযোগ, এই ধরণের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে সংগঠিত হচ্ছে এবং বন্দিদের “মানসিকভাবে ভেঙে দেওয়া” একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ।
পরিকল্পিত ‘পয়জনিং’ ও চিকিৎসা বঞ্চনা
পরিবারের অভিযোগ অনুযায়ী, রাজনৈতিক বন্দিদের নিয়মিত খাবার ও পানীয়র সঙ্গে অজানা রাসায়নিক পদার্থ মেশানো হচ্ছে। এতে বন্দিরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন এবং অনেকের মধ্যে মানসিক ভারসাম্যহীনতা, দীর্ঘস্থায়ী দুর্বলতা, এমনকি ত্বকের জটিল রোগের লক্ষণ দেখা দিয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকরা বলছেন, যদি এই অভিযোগ সত্য হয়, তাহলে এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের গুরুতর লঙ্ঘন। বন্দিদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য রক্ষা করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব।
বুদ্ধিজীবী নিধনের অভিযোগ
কিছু মানবাধিকারকর্মী দাবি করেছেন, এই পরিস্থিতি কেবল কারাগারের অভ্যন্তরীণ সংকট নয়—এটি রাজনৈতিকভাবে সচেতন নাগরিকদের মনন ধ্বংসের একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়া হতে পারে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে এই পদ্ধতিতে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও নেতৃত্বগুণসম্পন্ন মানুষদের শারীরিকভাবে অক্ষম করে দেওয়ার প্রচেষ্টা চলছে।
তবে সরকারপক্ষ থেকে এখনো পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
মানবাধিকার সংস্থার দাবি
জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই অভিযোগগুলোর প্রতি গভীর উদ্বেগ জানিয়েছে। তারা বলছে, কারাগার রাজনৈতিক প্রতিশোধের স্থান হতে পারে না।
তাদের আহ্বান—একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ তদন্ত কমিটি গঠন করে কারাগারের খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করা হোক।
জাতিসংঘের বন্দি আচরণবিধি (Mandela Rules)-এর আলোকে এই ধরণের অভিযোগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণও জরুরি বলে তারা মনে করছে।
তদন্তের প্রয়োজনীয়তা
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দণ্ডবিধি ও মানবাধিকার আইনের আওতায় কারা বন্দিদের খাদ্যে বিষমিশ্রণ বা চিকিৎসা বঞ্চনা দণ্ডনীয় অপরাধ।
অভিযোগগুলো যদি সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে তা রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি ও মানবাধিকারের প্রতি বড় ধরনের হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে।
অতএব, কাশিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের জন্য একটি নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি উঠেছে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ঢাকাস্থ কয়েকটি বিদেশি মানবাধিকার মিশন ইতোমধ্যে বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে।
তারা বলছে, রাজনৈতিক বন্দিদের মৌলিক অধিকার ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত করা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তির পরিপন্থী।
উপসংহার
বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও আইনের শাসন টিকিয়ে রাখতে কারা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
রাজনৈতিক মতভেদ বা ভিন্ন অবস্থান নির্বিশেষে, প্রত্যেক বন্দি সংবিধান অনুযায়ী মৌলিক অধিকার পাওয়ার যোগ্য।
এই অভিযোগগুলো প্রমাণিত না হলেও, এর দ্রুত তদন্ত না হলে রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
