ঢাকায় ৯,০০০ যুবক নিয়ে ইউনিফর্মধারী মিলিশিয়া মোতায়েন হচ্ছে আ.লীগের বিক্ষোভের আগে; এটি নিরাপত্তা না রাজনৈতিক দমন— প্রশ্ন উঠছে।
তারিখ: ৮ নভেম্বর ২০২৫ | রিপোর্ট: বিশেষ প্রতিনিধি
বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় আসন্ন ১০–১৩ নভেম্বর আওয়ামী লীগের ঘোষিত বিক্ষোভ ঘিরে অভূতপূর্ব নিরাপত্তা প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সূত্র বলছে, যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার নির্দেশে প্রায় ৯,০০০ সদস্যের একটি ব্যক্তিগত মিলিশিয়া বাহিনী গঠন করা হয়েছে, যারা ঢাকায় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে — তবে পুলিশ ইউনিফর্মে।
বাহিনীর কাঠামো ও মোতায়েন পরিকল্পনা
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ৭,০০০ জন পুলিশ কর্মকর্তা ও মিলিশিয়া সদস্যকে ঢাকার নয়টি গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরে মোতায়েন করা হবে
— রমনা, মতিঝিল, ওয়ারী, লালবাগ, তেজগাঁও, গুলশান, মিরপুর ও উত্তরা।
এই মোতায়েনের আওতায় রাজধানীর ৪৯টি থানার সকল এলাকা আসবে।
প্রতিটি থানায় বাহিনী প্লাটুন আকারে কাজ করবে।
ডেপুটি ও অ্যাসিস্ট্যান্ট ডেপুটি কমিশনারদের নেতৃত্বে কন্ট্রোল রুম থেকে নির্দেশনা দেওয়া হবে, এবং পুরো অপারেশন পরিচালিত হবে পুলিশের ওয়্যারলেস সিস্টেমের মাধ্যমে।
অস্ত্র, গোলাবারুদ ও পোর্টেবল ওয়্যারলেস রিসিভারসহ সদস্যরা পরিধান করবেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (DMP) মানক ইউনিফর্ম ও দমন গিয়ার।
অপারেশনের মূল লক্ষ্য
এই বিশেষ বাহিনীর অপারেশনাল উদ্দেশ্য হলো —
আওয়ামী লীগের বিক্ষোভ চলাকালে সম্ভাব্য সহিংসতা প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও দ্রুত মোকাবিলা।
এটি বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে শেখ হাসিনার বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণার সম্ভাবনা রয়েছে,
যা রাজনৈতিক উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
তথ্য সংগ্রহ ও মনিটরিং ব্যবস্থা
এই অপারেশনে গোয়েন্দা তথ্য প্রতি ঘণ্টায় সংগ্রহ করা হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সরাসরি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার, অতিরিক্ত কমিশনার এবং অপরাধ ও অপারেশন ইউনিটের প্রধানদের সঙ্গে ভাগ করা হবে।
পাশাপাশি আহতদের স্থানান্তরের জন্য পুলিশ যানবাহন প্রস্তুত রাখা হবে এবং
“সফল অপারেশনের জন্য পূর্ণ সমন্বয় অপরিহার্য” বলে অভ্যন্তরীণ বার্তায় উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষণ: নিরাপত্তা নাকি নিয়ন্ত্রণ কৌশল?
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, এ ধরনের “ইউনিফর্মধারী মিলিশিয়া” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে নতুন নয়,
তবে এইবার এর আকার ও পরিসর অভূতপূর্ব।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের নিরাপত্তা কাঠামো
দিন দিন কেন্দ্রীয়করণ ও আধাসামরিকীকরণের দিকে এগোচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আনিসুল করিম বলেন—
“যদি রাজনৈতিক আন্দোলন দমনের জন্য অ-পুলিশ সদস্যদের পুলিশ ইউনিফর্মে ব্যবহার করা হয়,
তাহলে এটি আইনি ও নৈতিক উভয় দিক থেকেই বিতর্কিত হয়ে উঠবে।”
তিনি আরও যোগ করেন—
“অন্তর্বর্তী সরকারের এই পদক্ষেপ আন্তর্জাতিকভাবে প্রশ্ন তুলবে —
এটি কি গণশৃঙ্খলা রক্ষা, নাকি বিরোধী শক্তিকে দমন করার কৌশল?”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও ঝুঁকি
জাতিসংঘ মানবাধিকার সংস্থা (OHCHR) এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূতাবাস ঢাকা পরিস্থিতির দিকে নিবিড়ভাবে নজর রাখছে বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।
যদি এই “ইউনিফর্মধারী বাহিনী” দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে,
তবে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক তদন্ত ও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে।
সার-সংক্ষেপ
১০–১৩ নভেম্বরের বিক্ষোভ ঢাকা শহরের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভারসাম্যের বড় পরীক্ষা হতে যাচ্ছে।
৯,০০০ সদস্যের এই গোপন সমন্বিত বাহিনী যদি সফলভাবে শান্তি বজায় রাখতে পারে, তাহলে এটি অন্তর্বর্তী সরকারের কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখা হবে।
কিন্তু যদি এই অপারেশন রাজনৈতিক সহিংসতা দমনের নামে নাগরিক অধিকার বা গণমাধ্যমের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, তাহলে এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ও অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা— দুই-ই ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
