বিশ্বব্যাংকের মতে ২০৩০ সালের মধ্যেই জলবায়ু ঝুঁকিতে সবচেয়ে হুমকির মুখে বাংলাদেশ। ঝুঁকি মোকাবেলায় পূর্ববর্তী সরকারের অর্জন ও ভবিষ্যৎ করণীয়।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন “From Risk to Resilience: Helping People and Firms Adapt in South Asia” সতর্ক করেছে যে ২০৩০ সালের মধ্যেই দক্ষিণ এশিয়া হবে বিশ্বের সবচেয়ে উচ্চ-ঝুঁকির অঞ্চল, আর সেই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকবে বাংলাদেশ। দেশের প্রায় ৯০% মানুষ বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, তাপপ্রবাহ ও সমুদ্র উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে সরাসরি জলবায়ু ঝুঁকিতে পড়বে — এমনটাই উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের ভাইস প্রেসিডেন্ট মার্টিন রেইজার বলেন, “ভৌগোলিক অবস্থান, জনসংখ্যার ঘনত্ব ও নিম্নাঞ্চল হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।”
বাংলাদেশ কেন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ?
১. ভৌগোলিক অবস্থান– বাংলাদেশের বড় অংশই ডেল্টা অঞ্চল, যা বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের প্রতি অত্যন্ত সংবেদনশীল।
২. অতিঘন জনসংখ্যা– ঘনবসতি মানে দুর্যোগে ক্ষতির মাত্রা বহু গুণ বাড়া।
৩. সমুদ্রপৃষ্ঠ উচ্চতা দ্রুত বৃদ্ধি– কক্সবাজার, বরগুনা, পটুয়াখালীর মতো উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা ও ভূমি হারানো এখন বড় সংকট।
আওয়ামী লীগ সরকারের জলবায়ু অভিযোজন সফলতা (২০০৯–২০২৪)
যদিও ঝুঁকি বাড়ছে, বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মিডিয়া বারবার স্বীকার করেছে যে গত এক দশকে বাংলাদেশ জলবায়ু অভিযোজনে একটি গ্লোবাল রোল মডেল।
১. ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার ব্যাপক কমানো
- ২০০৯ সালের আগে একটি বড় ঘূর্ণিঝড়ে হাজার-লাখ মানুষ মারা যেত।
- গত ১৫ বছরে সাইক্লোন শেল্টার (৪,০০০+), উপকূলীয় বাঁধ ও সিপিপি’র ৭৬,০০০ স্বেচ্ছাসেবীর কারণে
মোখা, আম্ফান, ইয়াস, সিত্রাং, রিমাল — কোন ঘূর্ণিঝড়েই মৃত্যুহার শতকের ঘরে ওঠেনি।
➡ সূত্র: বিশ্বব্যাংক, UNDRR রিপোর্ট
২. ডেল্টা প্ল্যান–২১০০ (২০১৮)
১০০ বছরের দীর্ঘমেয়াদি মাস্টারপ্ল্যান—যা বিশ্বের প্রথম জাতীয় ডেল্টা পরিকল্পনা। এর আওতায় ১৮০টির বেশি প্রকল্প চিহ্নিত।
৩. জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (২০০৯)
নিজস্ব অর্থায়নে ৪৫০ মিলিয়ন ডলারের ফান্ড—এ পর্যন্ত ৯০০+ প্রকল্প বাস্তবায়ন। এই উদ্যোগকে UNDP “অনন্য” হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
৪. মুজিব ক্লাইমেট প্রসপারিটি প্ল্যান (২০২১)
COP-২৬-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার “দুর্যোগ থেকে সমৃদ্ধি” ধারণা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়।
৫. নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিস্তার
– ২০০৯: ২৫ মেগাওয়াট সৌর শক্তি, ২০২৪: ১,২০০+ মেগাওয়াট, ২ কোটি মানুষ সোলার হোম সিস্টেমের আওতায়।
৬. উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ সবুজ বেষ্টনী
২ লাখ হেক্টরের বেশি নতুন বনায়ন—যা ঘূর্ণিঝড়ের ক্ষতি ২৫–৩০% পর্যন্ত কমায়।
৭. বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতিতে নেতৃত্ব
CVF-এর সভাপতির দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ প্যারিস চুক্তিতে “১.৫ ডিগ্রি লক্ষ্য” অন্তর্ভুক্ত করতে বড় ভূমিকা রাখে।
ভবিষ্যৎ ঝুঁকি মোকাবেলায় করণীয়
অবিলম্বে উপকূলীয় বাঁধ পুনর্নির্মাণ, নগর বন্যা ব্যবস্থাপনা আধুনিকায়ন, গ্রিন এনার্জি বিনিয়োগ দ্বিগুণ করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠী পুনর্বাসন, আন্তর্জাতিক তহবিল আহরণে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো।
এইসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে না পারলে দেশের অর্থনীতি, কৃষি, নগর ও শিল্পাঞ্চল তীব্র ঝুঁকিতে পড়বে।
