যুক্তরাজ্যের ভিসা জালিয়াতি ও হোম অফিসের কঠোর নিয়মে বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি স্থগিত করেছে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়। চাপ বাড়ছে নিয়োগ মানদণ্ডে।
ভিসা জালিয়াতি, হোম অফিসের কঠোর নিয়ম এবং ভিসা প্রত্যাখ্যান হার বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাজ্যের একাধিক বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশ ও পাকিস্তান থেকে শিক্ষার্থী ভর্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে। ব্রিটেনের স্বনামধন্য দৈনিক ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, অন্তত নয়টি বিশ্ববিদ্যালয় তাদের ভর্তিনীতি পরিবর্তন করে এই দুই দেশকে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ তালিকায় ফেলেছে।
কেন এই কঠোরতা?
হোম অফিস বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রকৃত পড়াশোনার পরিবর্তে স্থায়ীভাবে বসবাসের প্রবণতা বাড়ায় ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার রোধ জরুরি হয়ে উঠেছে। সীমান্ত নিরাপত্তা মন্ত্রী ডেম অ্যাঞ্জেলা ঈগল স্পষ্টভাবে সতর্ক করেছেন যে, যুক্তরাজ্যে আসা ভিসা যেন “স্থায়ী বসবাসের পেছনের দরজা” না হয়ে ওঠে।
২০২৪ সালে চালু হওয়া নতুন নিয়ম অনুযায়ী—
- বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ভিসা প্রত্যাখ্যান হার ৫%–এর নিচে রাখতে হবে (আগে ছিল ১০%)
- পাকিস্তান ও বাংলাদেশের প্রত্যাখ্যান হার যথাক্রমে ১৮% ও ২২%, যা নতুন সীমার চার গুণ
- ভিসা রিফিউজাল বাড়লে বিশ্ববিদ্যালয় স্পন্সর লাইসেন্স হারাতে পারে
- লাইসেন্স হারালে কমপক্ষে এক বছর তারা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী নিতে পারবে না
ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় বাংলাদেশ-পাকিস্তান থেকে ভর্তি বন্ধ রাখা ছাড়া বিকল্প দেখছে না।
কোন কোন বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি স্থগিত করেছে
- ইউনিভার্সিটি অব চেস্টার: পাকিস্তান থেকে ভর্তি ২০২৬ সালের শরৎ পর্যন্ত স্থগিত
- ইউনিভার্সিটি অব উলভারহ্যাম্পটন: পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে স্নাতক ভর্তি বন্ধ
- ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট লন্ডন: পাকিস্তান থেকে ভর্তি স্থগিত
- সান্ডারল্যান্ড ও কভেন্ট্রি বিশ্ববিদ্যালয়: বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের ভর্তি স্থগিত
- হার্টফোর্ডশায়ার বিশ্ববিদ্যালয়: দীর্ঘ ভিসা প্রসেসিংয়ের কারণে ২০২৬ পর্যন্ত স্থগিত
আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা পরামর্শক ভিনসেনজো রাইমো বলেছেন, “অল্প সংখ্যক সমস্যাযুক্ত আবেদনও বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইসেন্স ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।”
হোম অফিসের ‘বেসিক কমপ্লায়েন্স অ্যাসেসমেন্ট’–এ ২২টি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকিতে
সেপ্টেম্বর থেকে কার্যকর কঠোর নিয়মে অন্তত ২২টি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির তালিকায় এসেছে। এর মধ্যে পাঁচটি যেকোনো সময় স্পন্সর লাইসেন্স হারাতে পারে—যার ফলে কয়েক হাজার আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির সুযোগ হারাবে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থী কমেছে প্রায় ৩৯%
নতুন কঠোরতার ফলে ২০২২ সালে যেখানে যুক্তরাজ্যে পড়তে গিয়েছিল ১৫,২৩৪ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়ায় ৯,২৭৫—হ্রাস প্রায় ৩৯%।
নির্ভরশীল ভিসা সীমিত করা, কাজের ভিসায় রূপান্তরের বাধা এবং বৃত্তির শর্ত কঠোর হওয়াকে এই পতনের প্রধান কারণ বলা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য নয়—ডেনমার্ক, যুক্তরাষ্ট্রও কঠোর হচ্ছে
- ডেনমার্ক বলেছে, বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ফল খারাপ ও কোর্স সম্পন্নে ব্যর্থতার হার বেশি—তাই ভিসা শর্ত আরও কঠিন করা হচ্ছে।
- যুক্তরাষ্ট্র নতুন নিয়মে H-1B ভিসার আবেদন ফি ১ লাখ ডলার—যা পড়াশোনা শেষে চাকরি পাওয়া কঠিন করবে।
ইউনুস সরকারের নীতি ও আন্তর্জাতিক আস্থার পতন—জনমতের প্রতিক্রিয়া
অনেকে বলছেন, ডঃ ইউনুস ক্ষমতায় আসার পর বলেছিলেন, “বিশ্বের সবাই বাংলাদেশে আসবে।”
কিন্তু সাধারণ মানুষের মতে—চরম অর্থনৈতিক পতন, উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদের পুনরুত্থান, পাকিস্তানপন্থী নীতির অভিযোগ, রাষ্ট্রের অস্থিতিশীলতা এসব কারণে আন্তর্জাতিক আস্থা ভেঙে পড়েছে।
পাকিস্তানের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ের অভিযোগও পশ্চিমা দেশগুলোর নজর কাড়ছে—যার ফলেই যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বাংলাদেশ-পাকিস্তানকে একই ঝুঁকিগোষ্ঠীতে রেখেছে।
