প্রতিকী ছবি
যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ নানা দেশের অস্ত্র দেদারসে ঢুকছে বাংলাদেশে। নিরাপত্তা ঝুঁকি ও নীরবতার কারণ কী?
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদলের সন্ধিক্ষণে বাংলাদেশ আজ এক গভীর নিরাপত্তা সংকটের মুখে। গত ১৭ মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের উৎস, ধরন ও পরিমাণ নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের রীতিমতো আতঙ্কিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, জার্মানি, চীন, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, মিয়ানমার ও ভারতের তৈরি অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক এখন সন্ত্রাসীদের হাতে—যা আগে বাংলাদেশে কল্পনাও করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং একটি সংগঠিত অস্ত্র সরবরাহ নেটওয়ার্ক সক্রিয় হওয়ার ইঙ্গিত।
থানা-কারাগার লুট: অস্ত্র ছড়িয়ে পড়ার সূচনা
২০২৪ সালে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় দেশের ৪৬০টির বেশি থানা ও ফাঁড়ি থেকে বিপুল অস্ত্র লুট হয়। একই সময়ে ১৯টি কারাগার ভেঙে বেরিয়ে আসে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও জঙ্গিরা। সেই অস্ত্রের বড় অংশ আজও উদ্ধার হয়নি। এই অস্ত্রগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদেশি উৎস থেকে আসা ভয়ংকর আগ্নেয়াস্ত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের M24 স্নাইপার রাইফেল: প্রশ্নবিদ্ধ নীরবতা
২০২৪ সালের ১১ আগস্ট একটি নাম্বারপ্লেটহীন গাড়ি থেকে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা উদ্ধার করে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত M24 স্নাইপার রাইফেল।
এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর ব্যবহৃত সামরিক গ্রেড অস্ত্র, যা ৭.৬২ মি.মি. বুলেট ব্যবহার করে এবং দূরপাল্লার নির্ভুল হত্যার জন্য ব্যবহৃত হয়।
উদ্বেগজনক বিষয় হলো—এই অস্ত্র বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ২০২১ সাল থেকে ব্যবহার করছে।
তাহলে এই স্নাইপার গেল কীভাবে বেসামরিক হাতে? বিষয়টি নিয়ে এরপর আর কোনো তদন্ত অগ্রগতি প্রকাশ পায়নি।
বরং জুলাই দাঙ্গায় স্নাইপারে হত্যার কথা স্বীকার করেও উপদেষ্টা সাখাওয়াত হোসেন বিষয়টি ধামাচাপা দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
পাকিস্তানি অস্ত্র ও বিস্ফোরক: টেকনাফ থেকে চট্টগ্রাম
২০২৪ সালের ২২ নভেম্বর টেকনাফের সাবরাং এলাকায় র্যাব-১৫ উদ্ধার করে চারটি ৪০ মিমি ট্যাংক বিধ্বংসী রকেট হিট।
পরে ঢাকা ট্রিবিউন-এর এক প্রতিবেদনের সূত্র ধরে True Gazette-এর অনুসন্ধানে জানা যায়—এই অস্ত্র পাকিস্তানের করাচির রাষ্ট্রীয় Pakistan Machine Tool Factory-তে তৈরি।
সূত্র:
🔗 https://www.dhakatribune.com
এই অস্ত্র উদ্ধারের মাত্র পাঁচ দিন আগে করাচি বন্দর থেকে চট্টগ্রামে একটি জাহাজ ভিড়ে, যার কার্গো কোনো কায়িক পরীক্ষা ছাড়াই খালাস করা হয়।
‘ইন্সপেকশন ছাড়’ সিদ্ধান্ত ও ভয়ংকর পরিণতি
২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর রাজস্ব বিভাগ ঘোষণা দেয়—পাকিস্তান থেকে আসা পণ্যে কাস্টমস ইন্সপেকশন বাধ্যতামূলক নয়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা তখনই সতর্ক করেছিলেন, এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশকে নিষিদ্ধ পণ্য ও অস্ত্রের জন্য উন্মুক্ত করিডোরে পরিণত করবে।
এর প্রমাণ মেলে নভেম্বরেই—পোল্ট্রি ফিডের আড়ালে আমদানি করা হয় প্রায় ২৫ টন পপি সিড (হেরোইন উৎপাদনের কাঁচামাল)।
মিয়ানমার রুট ও আরসা সংযোগ
মিয়ানমার থেকেও নৌপথে অস্ত্র ঢুকছে বাংলাদেশে। আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি (ARSA)-র মাধ্যমে এই রুট পরিচালিত হচ্ছে বলে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র দাবি করেছে।
সংগঠনটির প্রধান আতাউল্লাহ আবু আম্মার জুনুনি পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত এবং আইএসআই-এর সহায়তায় অস্ত্র ও প্রশিক্ষণ পাওয়ার কথা তিনি নিজেই ভিডিও বার্তায় স্বীকার করেছিলেন।
২০১৬ সালে টেকনাফের নয়াপাড়া আনসার ক্যাম্পে হামলা করে ১১টি ভারী অস্ত্র লুট করেছিল আরসা।
বিদেশি অস্ত্র ও মাদক: একসাথে বিস্তার
সাম্প্রতিক সময়ে ইয়াবার জায়গা দখল করছে ‘আইস’। এই মাদক পাচারের অর্থ দিয়েই অস্ত্র কেনা হচ্ছে বলে গোয়েন্দা বিশ্লেষণ।
মাছ ধরার ট্রলারে বরফের নিচে আইস ও অস্ত্র পাচার হচ্ছে, যেখানে নজরদারি তুলনামূলক দুর্বল।
সেনাবাহিনীর স্বীকারোক্তি ও উদ্বেগ
বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ফেসবুক পেজে নিয়মিত বিদেশি অস্ত্র উদ্ধারের খবর প্রকাশ পাচ্ছে। সেনা কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন—এত আধুনিক অস্ত্র বাংলাদেশে আগে কখনো দেখা যায়নি।
কোথায় যাচ্ছে বাংলাদেশ?
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়; বরং একটি বৃহৎ ভূ-রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক অস্ত্র সরবরাহ নেটওয়ার্কের অংশ।
পাকিস্তান, মিয়ানমার ও আন্তর্জাতিক অপরাধচক্রের সম্পৃক্ততা নতুন করে জাতীয় নিরাপত্তা প্রশ্নে ফেলেছে বাংলাদেশকে।
রাষ্ট্র যদি এখনই কঠোর সীমান্ত নজরদারি, কাস্টমস ইন্সপেকশন ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা না দেখায়—তবে বাংলাদেশ অচিরেই দক্ষিণ এশিয়ার নতুন অস্ত্র-ট্রানজিট হাবে পরিণত হতে পারে।
