শরীয়তপুরের ডামুড্যায় দুর্বৃত্তদের কুপিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে দগ্ধ করার ঘটনায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন ব্যবসায়ী খোকন দাস।
শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলায় এক নৃশংস হামলার শিকার হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন ব্যবসায়ী ও পল্লী চিকিৎসক খোকন চন্দ্র দাস (৫০)। ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে গুরুতর জখম করার পর শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার ঘটনায় তিনি মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বৃহস্পতিবার (৩ জানুয়ারি) সকালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
এই নির্মম হত্যাকাণ্ডে পুরো ডামুড্যা উপজেলায় তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে।
নিহত খোকন দাসের পরিচয়
নিহত খোকন চন্দ্র দাস শরীয়তপুরের ডামুড্যা উপজেলার কনেশ্বর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের তিলই গ্রামের বাসিন্দা। তিনি পরেশ দাসের ছেলে। স্থানীয়ভাবে তিনি একজন পল্লী চিকিৎসক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাশাপাশি কেউরভাঙ্গা বাজারে দীর্ঘদিন ধরে একটি ওষুধের দোকান পরিচালনা করতেন।
এছাড়া তিনি বিকাশ ও নগদের মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্ট হিসেবেও কাজ করতেন। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, খোকন দাস ছিলেন শান্ত স্বভাবের, সাদাসিধে ও নিরীহ একজন মানুষ, যার সঙ্গে কারও দৃশ্যমান শত্রুতা ছিল না।
কীভাবে ঘটল হামলাটি
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রাত আনুমানিক ৯টার দিকে প্রতিদিনের মতো নিজের দোকান বন্ধ করে বাড়ির উদ্দেশে রওনা হন খোকন দাস। বাড়ির কাছাকাছি পৌঁছালে তিন থেকে চারজন কিশোর ও যুবক তাকে ঘিরে ধরে।
প্রথমে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে তাকে গুরুতর আহত করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীদের ধারণা, শুরুতে ঘটনাটি ছিনতাইয়ের চেষ্টা হিসেবে চালানো হলেও, একপর্যায়ে খোকন দাস হামলাকারীদের চিনে ফেলেন। তখন তারা ঘটনাস্থলেই তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়।
আগুনে দগ্ধ হয়ে জীবন-মৃত্যুর লড়াই
দুর্বৃত্তদের আগুন ধরানোর ফলে খোকন দাসের শরীরের বিভিন্ন অংশ মারাত্মকভাবে পুড়ে যায়। তার চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন ছুটে এসে আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন এবং তাকে উদ্ধার করেন।
গুরুতর আহত অবস্থায় প্রথমে তাকে শরীয়তপুর সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সেখানে অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা তাকে দ্রুত ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে স্থানান্তর করেন।
ঢাকা মেডিকেলের বার্ন ইউনিটের আইসিইউতে টানা চিকিৎসা চললেও শেষ পর্যন্ত আজ সকাল ৭টা ২০ মিনিটে তিনি মৃত্যুর কাছে হার মানেন।
এলাকায় আতঙ্ক, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের সন্দেহ
ঘটনার পর থেকে ডামুড্যা ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এমন নৃশংস ও নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ড আগে তারা দেখেননি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি বলেন,
“এটা কোনো সাধারণ ছিনতাইয়ের ঘটনা নয়। যেভাবে কুপিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরানো হয়েছে, তাতে এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে।”
স্থানীয়দের মতে, এই ঘটনার পর মানুষ সন্ধ্যার পর ঘর থেকে বের হতে ভয় পাচ্ছে।
পরিবার ও স্বজনদের আহাজারি
খোকন দাসের মৃত্যুর খবরে তার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে শোকের মাতম চলছে। পরিবারটি এখন চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে বলে জানিয়েছেন স্বজনরা।
তারা জানান, খোকন দাস ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তার মৃত্যুতে পরিবারটি আর্থিক ও মানসিকভাবে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে।
প্রশাসনের ভূমিকা ও তদন্তের দাবি
ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে এখনো এ ঘটনায় কাউকে গ্রেপ্তারের খবর পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসী ও নিহতের স্বজনরা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের দাবি,
- প্রকৃত হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করতে হবে
- পরিকল্পনাকারী ও সহায়তাকারীদেরও আইনের আওতায় আনতে হবে
- দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন অপরাধ রোধ করতে হবে
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের নৃশংস হামলা শুধু একটি ব্যক্তিগত হত্যাকাণ্ড নয়, বরং এটি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দুর্বলতার দিকও তুলে ধরছে।
বিশেষ করে নির্বাচন-পূর্ব সময়ে এমন সহিংসতা জনমনে নিরাপত্তাহীনতা বাড়াচ্ছে।
উপসংহার
শরীয়তপুরের ডামুড্যায় খোকন দাসকে কুপিয়ে পেট্রোল ঢেলে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনা শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো এলাকার মানুষের নিরাপত্তা ও মানবিক বোধকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে।
দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে এমন অপরাধ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে—এমন আশঙ্কাই করছেন স্থানীয়রা।
