চুয়েটে শিক্ষক নিয়োগে ভয়াবহ স্বজনপ্রীতির অভিযোগ। ফার্স্ট হয়েও বাদ পড়লেন শিবাশ্রী, তৃতীয় হয়েও শিক্ষক হলেন উপাচার্যের মেয়ে।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (চুয়েট) শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে ভয়াবহ অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে তোলপাড় শুরু হয়েছে। খোদ উপাচার্য ড. আব্দুল মতিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে—নিজের মেয়েকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি মেধাতালিকায় শীর্ষে থাকা যোগ্য প্রার্থীদের পরিকল্পিতভাবে বাদ দিয়েছেন।
এই অভিযোগকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে তীব্র ক্ষোভ, হতাশা ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের ভাষায়, এটি শুধু অনিয়ম নয়—এটি মেধাভিত্তিক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার ওপর সরাসরি আঘাত।
অলিখিত রেওয়াজ ভেঙে দেওয়া হলো কীভাবে
বাংলাদেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি অলিখিত কিন্তু প্রতিষ্ঠিত রীতি রয়েছে—সংশ্লিষ্ট বিভাগের মেধাতালিকায় প্রথম ও দ্বিতীয় স্থান অর্জনকারীদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। বিশেষ করে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই প্রথা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়ে থাকে।
কিন্তু চুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড টেলিকমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিং (ইটিই) বিভাগে এই রেওয়াজ কার্যত ভেঙে ফেলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
কারা বাদ পড়লেন, কারা সুযোগ পেলেন
অভিযোগ অনুযায়ী, ইটিই বিভাগের ১৮তম আবর্তের শিক্ষার্থী শিবাশ্রী সেন মেধাতালিকায় প্রথম স্থান অধিকার করেছিলেন। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন তাসনিয়া নশিন অরিন। নিয়ম অনুযায়ী তাদেরই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার কথা ছিল।
অন্যদিকে, উপাচার্য ড. আব্দুল মতিনের মেয়ে জেরিন তাসনিম মাইমুনা ছিলেন ১৯তম আবর্তের শিক্ষার্থী এবং নিজ ব্যাচে তার অবস্থান ছিল তৃতীয়।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, এই তৃতীয় স্থানধারীকে শিক্ষক বানাতেই পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়াকে ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুরিয়ে দেওয়া হয়েছে।
রহস্যজনকভাবে বাতিল হওয়া নিয়োগ বোর্ড
২০২৪ সালের ১১ নভেম্বর ইটিই বিভাগে দুইজন শিক্ষক নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ওই বিজ্ঞপ্তির আওতায় শিবাশ্রী সেন ও তাসনিয়া নশিন অরিন আবেদন করেন। তারা লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মৌখিক পরীক্ষাতেও অংশ নেন।
কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগের ঠিক আগ মুহূর্তে কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা ছাড়াই সেই নিয়োগ বোর্ড বাতিল ঘোষণা করা হয়।
শিক্ষার্থীদের দাবি,
“ওই সময় উপাচার্যের মেয়ের একাডেমিক ফল বা প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। তাই সময়ক্ষেপণ ও পরিস্থিতি বদলানোর জন্যই বোর্ড বাতিল করা হয়।”
নতুন বিজ্ঞপ্তি, পুরনো অভিযোগ
পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৯ জুলাই একই বিভাগে তিনজন প্রভাষক নিয়োগের জন্য নতুন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এবারও শিবাশ্রী সেন পরীক্ষায় অংশ নেন।
কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, মেধাতালিকায় প্রথম হওয়া সত্ত্বেও তাকে আবারও বাদ দেওয়া হয়।
পরিবর্তে ১৯তম আবর্তের প্রথম ও দ্বিতীয় স্থানধারীর সঙ্গে উপাচার্যের মেয়ে—যিনি তৃতীয় ছিলেন—নিয়োগ পান।
এই নিয়োগকে শিক্ষার্থীরা “পরিকল্পিত ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে আখ্যা দিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক চুয়েটের একাধিক শিক্ষার্থী বলেন,
“উপাচার্যের মেয়েকে শিক্ষক বানানোর জেদ থেকেই আগের ব্যাচের ফার্স্ট ও সেকেন্ডদের বাদ দেওয়া হয়েছে। এটি কেবল স্বজনপ্রীতি নয়, এটি মেধার সঙ্গে সরাসরি প্রতারণা।”
আরেক শিক্ষার্থীর ভাষায়, “একজন ফার্স্ট হওয়া শিক্ষার্থীকে বাদ দিয়ে তৃতীয় হওয়া প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া মানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নৈতিকতার কবর রচনা করা।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ
শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, উপাচার্যের মতো দায়িত্বশীল পদে থেকে এমন অভিযোগ ওঠা চুয়েটের মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগে স্বচ্ছতা, মেধা ও নৈতিকতা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সেখানে উপাচার্যের ব্যক্তিগত সম্পর্ক যদি নিয়োগের নিয়ামক হয়ে ওঠে, তবে পুরো ব্যবস্থার ওপরই মানুষের আস্থা ভেঙে পড়ে।
প্রশাসনের নীরবতা ও প্রশ্ন
এ বিষয়ে এখনো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা বা প্রতিবাদ পাওয়া যায়নি।
উপাচার্য ড. আব্দুল মতিন বা নিয়োগ বোর্ডের কেউই প্রকাশ্যে অভিযোগের জবাব দেননি।
এই নীরবতাও সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করছে বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থীদের দাবি
চুয়েটের সাধারণ শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে—
- বিতর্কিত নিয়োগ বাতিল
- নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন
- মেধার ভিত্তিতে পুনরায় শিক্ষক নিয়োগ
- ভবিষ্যতে স্বজনপ্রীতি রোধে কঠোর নীতিমালা
প্রণয়নের দাবি জানিয়েছেন।
উপসংহার
চুয়েটে শিক্ষক নিয়োগকে ঘিরে ওঠা এই অভিযোগ শুধু একটি নিয়োগ বিতর্ক নয়; এটি দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, নৈতিকতা ও মেধাভিত্তিক কাঠামোর ওপর বড় প্রশ্নচিহ্ন।
দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে, এই বিতর্ক চুয়েটের পাশাপাশি পুরো উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ওপরই নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
