বিএনপি কার্যালয়ে এনএসআই মহাপরিচালকের সঙ্গে তারেক রহমানের রুদ্ধদ্বার বৈঠক ঘিরে গোয়েন্দা নিরপেক্ষতা ও সামরিক শিষ্টাচার প্রশ্নের মুখে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা ইতিহাসে নজিরবিহীন এক ঘটনা ঘটেছে। প্রথমবারের মতো কোনো কর্মরত জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সরাসরি একটি রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে গিয়ে দলটির শীর্ষ নেতার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থার (এনএসআই) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরওয়ার ফরিদ বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে গিয়ে দলটির সদ্য নিযুক্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন।
এই ঘটনা ঘিরে সামরিক, গোয়েন্দা ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা, প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
কখন ও কোথায় বৈঠক
নির্ভরযোগ্য সূত্র অনুযায়ী, এনএসআই মহাপরিচালক আজ দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে গুলশানের বিএনপি চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রবেশ করেন।
সেখানে তিনি সদ্য প্রয়াত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার শোকে মুহ্যমান তারেক রহমানের সঙ্গে একান্ত বৈঠকে বসেন।
এই বৈঠক চলে দুপুর ১টা ২১ মিনিট পর্যন্ত। প্রায় এক ঘণ্টার এই রুদ্ধদ্বার সাক্ষাৎ সম্পর্কে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পক্ষই বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
কেন এই বৈঠক ব্যতিক্রম
বাংলাদেশে গোয়েন্দা সংস্থা ও সামরিক বাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রথা হলো—রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে এমন সংবেদনশীল বৈঠক হলে তা হয় রাষ্ট্রীয় বাসভবনে, ব্যক্তিগত আবাসে অথবা নিরপেক্ষ ও গোপন স্থানে।
কোনো দলীয় কার্যালয়ে গিয়ে কর্মরত গোয়েন্দা প্রধানের সাক্ষাৎকে নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা ‘প্রথা-বহির্ভূত’ এবং ‘ঝুঁকিপূর্ণ দৃষ্টান্ত’ হিসেবে দেখছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এতে গোয়েন্দা সংস্থার রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
এনএসআই প্রধানের নিয়োগের প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র পাঁচ দিন পর, ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট মেজর জেনারেল আবু মোহাম্মদ সরওয়ার ফরিদকে এনএসআই-এর মহাপরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এর আগে তাকে ঘাটাইলভিত্তিক ১৯তম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি হিসেবে বদলির বিষয়টি আলোচনায় থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি।
এই নিয়োগের পর থেকেই সেনা ও গোয়েন্দা মহলে তার ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল।
তারেক রহমানকে ঘিরে ‘অতি-উৎসাহী’ আচরণ?
প্রতিরক্ষা সূত্রগুলোর দাবি, ২৫ ডিসেম্বর তারেক রহমান দেশে ফেরার পর থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও চাকরিরত সেনা কর্মকর্তা সামরিক বিধি ও শিষ্টাচার উপেক্ষা করে তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, একজন রাজনৈতিক দলের চেয়ারম্যান—যিনি বর্তমানে সংসদ সদস্য নন, কোনো নির্বাহী রাষ্ট্রীয় পদেও নেই
—তার সঙ্গে এভাবে কর্মরত ঊর্ধ্বতন সেনা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সরাসরি যোগাযোগ অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।
জানাজা ঘিরে বিতর্ক ও সামরিক অস্বস্তি
সাম্প্রতিক সময়ে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা ঘিরেও সামরিক মহলে অস্বস্তির সৃষ্টি হয়েছে।
জানাজার সময় অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মুহাম্মদ হাকিমুজ্জামানকে বিএনপি সভাপতির হাতে টিস্যু পেপার এগিয়ে দিতে দেখা যায়,
যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
এই কর্মকর্তা এর আগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) গুম ও নির্যাতনের অভিযোগে অভিযুক্ত ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার গ্রেফতারের যৌক্তিকতা প্রকাশ্যে ব্যাখ্যা করে আলোচনায় আসেন।
প্রটোকল লঙ্ঘনের অভিযোগ
আরও বিতর্ক তৈরি হয় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তারেক রহমানের শ্রদ্ধা নিবেদনকে ঘিরে।
সেখানে সেনাবাহিনীর একটি কন্টিনজেন্ট ও দুইজন সৈনিককে পুষ্পস্তবক বহন ও মার্চ করতে দেখা যায়।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি সেনাবাহিনীর দীর্ঘদিনের প্রটোকল ও বিধির পরিপন্থী। সাধারণত এমন সম্মান কেবল রাষ্ট্রপ্রধান, সরকারপ্রধান বা সাংবিধানিক গুরুত্বপূর্ণ পদধারীদের জন্য সংরক্ষিত।
সামরিক শৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই ধারাবাহিক ঘটনাগুলো সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা, নিরপেক্ষতা ও পেশাদারিত্বের জন্য শুভ সংকেত নয়।
একজন অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তা বলেন,
“রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় সামরিক বাহিনীর নিরপেক্ষতা সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। ব্যক্তিবিশেষকে ঘিরে অতিরিক্ত সৌজন্য ভবিষ্যতে বিপজ্জনক নজির তৈরি করতে পারে।”
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া কী?
এই ঘটনার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বা বৈশ্বিক নিউজ এজেন্সিতে নিশ্চিত ও স্বতন্ত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।
ফলে বিষয়টি আপাতত দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা আলোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।
তবে কূটনৈতিক মহল মনে করছে, এমন প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতেও বিষয়টি আসতে পারে।
উপসংহার
বিএনপি কার্যালয়ে এনএসআই মহাপরিচালকের রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুধু একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ—না কি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাগত বার্তা—তা এখনো অস্পষ্ট।
তবে একথা স্পষ্ট, এই ঘটনা বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থা, সামরিক শিষ্টাচার ও রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে, এই প্রথা-বহির্ভূত ঘটনাগুলো ভবিষ্যতে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর জন্য জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
