ইপিআই কার্যক্রম চালু রাখতে ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি ক্রয়ে ৬১০ কোটি টাকার টিকা কিনছে সরকার। কেন দরপত্র ছাড়াই এই সিদ্ধান্ত—জানুন বিস্তারিত।
ইউনিসেফের মাধ্যমে সরাসরি টিকা ক্রয়ের অনুমোদন
সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) অব্যাহত রাখতে দরপত্র ছাড়াই ইউনিসেফের মাধ্যমে ৬১০ কোটি টাকার টিকা কেনার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে অর্থনৈতিক বিষয়ক সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটি। চলতি ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সব রুটিন ইপিআই টিকা সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে কেনা হবে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত কমিটির বৈঠকে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ সভাপতিত্ব করেন। বৈঠক শেষে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এ তথ্য জানানো হয়।
কেন দরপত্র ছাড়াই টিকা কেনা হচ্ছে
স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ইপিআই কার্যক্রম শুরুর পর থেকেই ব্যবহৃত সব ভ্যাকসিন ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয় বা সংগ্রহ করা হচ্ছে। এসব ভ্যাকসিন অত্যন্ত তাপ-সংবেদনশীল এবং অবশ্যই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মান নিয়ন্ত্রণপ্রাপ্ত হতে হয়।
সরকারের যুক্তি অনুযায়ী, ইউনিসেফের মাধ্যমে ক্রয় করলে—
- ভ্যাকসিনের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত থাকে
- আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংরক্ষণ ও পরিবহন সহজ হয়
- তুলনামূলকভাবে কম দামে টিকা পাওয়া যায়
এই কারণেই দরপত্র প্রক্রিয়া ছাড়াই সরাসরি ক্রয়ের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
ব্যয় ও অর্থের উৎস
প্রস্তাবে জানানো হয়, কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে নেওয়া ঋণের ১৭৫.৯৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এখনো অব্যয়িত রয়েছে। এই তহবিল থেকে—
- ৪৯.৯২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করা হবে ইপিআই টিকা কেনার জন্য
বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬১০ কোটি ১৭ লাখ ২২ হাজার টাকা।
এর আগেও গত বছরের সেপ্টেম্বরে একই পদ্ধতিতে তিন মাসের জন্য টিকা কেনার অনুমোদন দিয়েছিল সরকার।
কোন কোন টিকা দেওয়া হচ্ছে ইপিআইয়ের আওতায়
বর্তমানে বাংলাদেশে ইপিআই কর্মসূচির আওতায় ১০টি টিকা বিনামূল্যে দেওয়া হচ্ছে। এগুলো হলো—
- যক্ষ্মা (টিবি)
- ডিপথেরিয়া
- হুপিংকাশি (পারটুসিস)
- ধনুষ্টংকার (টিটেনাস)
- হেপাটাইটিস বি
- হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা বি (এইচআইবি)
- নিউমোকক্কাল নিউমোনিয়া (পিসিভি)
- পোলিও
- হাম
- রুবেলা
ইপিআই কার্যক্রমের ইতিহাস
বাংলাদেশে ইপিআই কার্যক্রম শুরু হয় ১৯৭৯ সালের ৭ এপ্রিল। তখন এক বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য ছয়টি সংক্রামক রোগের টিকা দেওয়া হতো। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে ভ্যাকসিন শিডিউলে নতুন টিকা যুক্ত হয়—
- ২০০৩: হেপাটাইটিস বি
- ২০০৯: এইচআইবি
- ২০১২: রুবেলা
- ২০১৫: পিসিভি, আইপিভি ও এমআর দ্বিতীয় ডোজ
- ২০১৭: এফআইপিভি
গ্যাভি ও ইউনিসেফের ভূমিকা
ইউনিসেফ ও গ্লোবাল অ্যালায়েন্স ফর ভ্যাকসিনস অ্যান্ড ইমিউনাইজেশন (গ্যাভি)–এর সহায়তায় ইপিআই কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে পরিচালিত হয়ে আসছে। ১৯৭৪ সালে বিশ্বের প্রতিটি শিশুর জন্য টিকা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে গ্যাভির কার্যক্রম শুরু হয়।
ইপিআই কর্মসূচির সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৯ সালে গ্যাভি বাংলাদেশকে ‘ভ্যাকসিন হিরো’ পদকে ভূষিত করে।
তবে গত বছর থেকে বাংলাদেশকে নিজস্ব অর্থায়নে ইপিআই টিকা কিনতে হচ্ছে। এর আগে অধিকাংশ টিকা আন্তর্জাতিক সহায়তায় বিনামূল্যে পাওয়া যেত।
শিশু মৃত্যুহার কমাতে ইপিআইয়ের ভূমিকা
ইপিআই সহায়িকা অনুযায়ী, কর্মসূচি শুরুর আগে বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই লাখ শিশু ছয়টি সংক্রামক রোগে মারা যেত। নিয়মিত টিকাদানের ফলে যক্ষ্মা, ডিপথেরিয়া, হুপিংকাশি, হাম ও ধনুষ্টংকারসহ বিভিন্ন রোগে শিশু মৃত্যুহার উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখতে নিরবচ্ছিন্ন টিকা সরবরাহ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
